৩১ অক্টোবর জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ৩১ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিবাদ’ শিরোনামের প্রেস ব্রিফিং আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এতে আমরা জানতে পেরেছি যে ২৮ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে বিএনপি-জামায়াতের কর্মসূচি ও পরবর্তীতে বাংলাদেশে সংঘটিত সহিংস ঘটনাবলী জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। তবে, প্রেস ব্রিফিংয়ে উল্লিখিত কিছু পর্যবেক্ষণ তথ্যনির্ভর মনে হয়নি এবং এ কারণে এটি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, প্রেস ব্রিফিংয়ের শিরোনাম- ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিবাদ’ ঘটনার প্রকৃত অবস্থাকে প্রতিফলিত করে না। গত অক্টোবর মাসের ২৮ তারিখে এবং তারপরে বাস্তবে যা ঘটেছে তা সঠিকভাবে বোঝার জন্য আমরা এখানে সেসবের প্রকৃতচিত্র তুলে ধরছি। নির্বিচার অগ্নিসংযোগ, পুলিশ হত্যা, জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারা এবং ভাঙচুরসহ সব ধরনের সহিংসতাকে ‘রাজনৈতিক প্রতিবাদ’- এর অন্তর্ভুক্ত করায় এই বিবৃতিটি অপরাধীদেরকে তাদের নৃশংস সহিংস কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে পারে।
বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের অন্যান্য বিচারকের বাসভবনে হামলাকারী সকল দুষ্কৃতকারীকে বিএনপির কর্মী হিসেবে শনাক্ত করা হলেও বিবৃতিতে তার প্রতিফলন ঘটেনি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিরোধী দলের কর্মীরা হামলা করেছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে- এ ধরনের মন্তব্যে প্রকৃত অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, বিবৃতিতে হামলাকারীদের সরকারি দলের সমর্থক বলে মনে করা হয় বলেও মন্তব্য করা হয়েছে। এ ধরনের বক্তব্যের কারণে জনমনে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হতে পারে।
১১ জনের মৃত্যুর খবরটি, বিশেষভাবে সহিংসতায় বিরোধী দলের ছয় সদস্য নিহত হয়েছে বলে যে দাবি করা হয়েছে তা বিভ্রান্তিকর। প্রকৃতপক্ষে ‘রাসেল হাওলাদার এবং ইমারান হোসেন’ নামে দুই গার্মেন্ট শ্রমিক পৃথক ঘটনায় মারা গেছেন। অন্যদিকে জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা এবং তাকে ২৯ অক্টোবর লালমনিরহাটে বিএনপির কর্মীরা হত্যা করেছে। শামীম নামে অপর নিহত ব্যক্তি, যিনি ২৮ অক্টোবর বিএনপির সমাবেশে মারা গিয়েছেন তিনি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না বলে তার বাবা ইউসুফ নিশ্চিত করেছেন। আরেক নিহত রফিক ভূঁইয়া (৭৩) বিএনপি যাকে পুলিশের হামলায় নিহত বলে দাবি করেছে, তার মেয়ে ঊর্মি ভূঁইয়া মিডিয়াকে জানিয়েছেন, তার বাবা সহিংসতার মধ্যে ছিলেন না এবং রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায় রিকশা থেকে পড়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মারা যান। পুলিশ কনস্টেবল আমিরুল হক পারভেজ ২৮ অক্টোবর পল্টনে বিএনপি সমাবেশস্থলের কাছে বর্বরোচিত হত্যার শিকার হন এবং ২৯ অক্টোবর ভোররাতে ঘুমের মধ্যে বাসের হেলপার মোঃ নঈমকে পুড়িয়ে হত্যা করে বিরোধী দলের বিক্ষোভকারীরা।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিরোধী দলের কর্মী আব্দুর রশিদের মৃত্যু সম্পর্কে দেশের শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি সংবাদপত্র দি ডেইলি স্টার লিখেছে, বিএনপি কর্মীর নিচে পড়ে মৃত্যুবরণ। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বেশিরভাগ মূলধারার গণমাধ্যম জানিয়েছে, ২৯ অক্টোবর শহরের অপর প্রান্তে একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর পালানোর সময় একটি নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ থেকে পড়ে তার মৃত্যু হয়।
যুবদলের (বিএনপির যুব সংগঠন) কর্মী জিলু আহমেদ ৩১ অক্টোবর ঢাকা থেকে প্রায় ২৩৫ কিলোমিটার দূরে সিলেটের একটি মহাসড়কে বিএনপির সহিংস মিছিলে যোগ দেওয়ার সময় তার দ্রুতগামী মোটরসাইকেল একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগলে গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, বিল্লাল হোসেন ও রিফাত উল্লাহ বিএনপির প্রায় ১৫শ উচ্ছৃঙ্খল নেতা-কর্মীর মধ্যে ছিলেন। তারা ভারি অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বেআইনিভাবে একটি সহিংস সমাবেশ করে। সমাবেশ থেকে পুলিশের ওপর আক্রমণ করা হয়। কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচরে ৩১ অক্টোবর আনুমানিক সাড়ে আটটায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের দুজনেরই মৃত্যু হয়।
বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের অন্যান্য বিচারপতির বাসভবনে নজিরবিহীন আক্রমণে গোটা জাতি স্তম্ভিত। প্রায় ৩৫ জন সাংবাদিককে আহত করার ঘৃণ্য ঘটনাও জাতিকে উদ্বিগ্ন করেছে। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে ইতিমধ্যে এ ঘটনায় জড়িত মুখোশধারী ও অন্য আক্রমণকারীদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং বিএনপি’র সঙ্গে তাদের সুস্পষ্ট যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে মারার এবং কুপিয়ে হত্যা করার ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কিছু আক্রমণকারী মুখোশ পরে ছিল। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় এর অনুমান যে, মুখোশ পরা আক্রমণকারীরা ছিল ক্ষমতাসীন দলের লোক। তাদের এই অনুমান বিভ্রান্তিকর এবং বিষয়টি গভীর পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে।
উল্লেখ্য যে, সব গণমাধ্যম ২৮ অক্টোবর ঢাকা দক্ষিণ যুবদলের (বিএনপি) সদস্য-সচিব রবিউল ইসলামের ‘প্রেস’ লেখা ভেস্ট পরে গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ছবি ও ভিডিও সহকারে সংবাদ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের ব্রিফিং নোটে বলা হয়েছে, পুলিশ রড দিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর আক্রমণ করেছে। অথচ এর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। বরং দেখা গেছে, আক্রমণকারীরা অত্যন্ত সহিংস হয়ে উঠলে পুলিশ বিধি মোতাবেক শুধুমাত্র লাঠি, টিয়ার শেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
পুলিশের তল্লাশি অভিযান ও নির্বিচার গ্রেফতার নিয়ে অভিযোগ বিষয়ে আমরা মনে করি পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ২৮ অক্টোবর সর্বোচ্চ ধৈর্য্য প্রদর্শন করেছে।
বিবৃতিতে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানিয়ে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের অন্যান্য বিচারপতির বাসভবনে হামলা, সাংবদিকদের ওপর ন্যাক্কারজনক আক্রমণ, পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে মারা, সেন্ট্রাল পুলিশ হাসপাতালে ভাঙচুর চালিয়ে অগ্নিসংযোগ, কয়েক ডজন গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, বৃহত্তম পুলিশ লাইনে হামলা করা, নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মারার নিষ্ঠুরতা যেন জাতিসংঘ থেকে বিবৃতি দেওয়ার সময় বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরদাতারা হলেন- অর্থনীতিবিদ ও পরিবেশবিদ ডঃ কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি এবং ছায়ানটের নির্বাহী সভাপতি ড. সারওয়ার আলী, মুক্তিযোদ্ধা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, (বিএসএমএমইউ) অধ্যাপক ডাঃ কামরুল হাসান খান, সাবেক সচিব কে.এইচ. মাসুদ সিদ্দিকী,
বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ নুরুল হুদা, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, প্রফেসর ড. মোঃ মুস্তাফিজুর রহমান, সাবেক সচিব উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত, অভিনেতা ও মঞ্চ পরিচালক রামেন্দু মজুমদার, বিএসএমএমইউ সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. কনক কান্তি বড়ুয়া, বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক ড. হাসান মাহমুদ খন্দকার, রাষ্ট্রদূত মোঃ আব্দুল হান্নান, মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মী নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, সাবেক সিনিয়র সচিব সৌরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী, সাবেক সচিব মোহাম্মদ সিরাজুল হক খান, এডিটরস গিল্ড এর সভাপতি মোজাম্মেল বাবু, সাবেক সচিব অপরূপ চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ট্রাস্টি মফিদুল হক, ডিএমপির সাবেক পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, সাবেক সচিব অশোক কুমার বিশ্বাস, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক, সাবেক সচিব ডঃ প্রশান্ত কুমার রায়, অশোক মাধব রায়, মোঃ নাসির উদ্দিন আহমেদ, সুবীর কিশোর চৌধুরী, সাবেক সিনিয়র সচিব মোঃ আব্দুস সামাদ, রাষ্ট্রদূত সুহরাব হোসেন , প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামান, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির, বি.পি. সাবেক মুখ্য সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, রাষ্ট্রদূত একেএম আতিকুর রহমান, বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ডঃ বেনজীর আহমেদ, চলচ্চিত্র নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল, রাষ্ট্রদূত গোলাম মুহাম্মদ, সাবেক সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ সহিদুল হক, সাবেক অধ্যাপক আব্দুল মান্নান চৌধুরী, রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ, সাংবাদিক কাশেম হুমায়ুন, অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান, মুক্তিযোদ্ধা ও প্রকাশক ওসমান গণি, রাষ্ট্রদূত চৌধুরী ইখতিয়ার মমিন। সাবেক মুখ্য সচিব মোঃ আবুল কালাম আজাদ, রাষ্ট্রদূত মাহবুব উজ জামান। সাবেক সচিব এবং সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ সাদিক, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ,এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন ভাইস-চ্যান্সেলর ড. রুবানা হক, রাষ্ট্রদূত এটিএম নজরুল ইসলাম, সাবেক সচিব এম এ কাদের সরকার, সুনীল কান্তি বোস, শমল কান্তি ঘোষ, মোঃ ফজলুল হক, প্রাক্তন চেয়ারম্যান মানবাধিকার কমিশন মিসেস নাসিমা বেগম, সাংবাদিক মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, সাবেক সিনিয়র সচিব মোঃ দিলওয়ার বখত, কবি ও সাংবাদিক নাসির আহমেদ, প্রাক্তন জেলা জজ জেসমিন আরা বেগম, প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন, দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত, ডিবিসি নিউজের সিইও মঞ্জুরুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. ইকবাল আর্সেনাল, অধ্যাপক ড. দ্বীন মুহাম্মদ নুরুল হক, প্রফেসর ড. মোঃ নুরুল আমিন, অধ্যাপক ড. বোরেন চক্রবর্তী। সাংস্কৃতিক কর্মী পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, স্থপতি ও লেখক ডঃ নিজাম উদ্দিন, রাষ্ট্রদূত মোঃ শহিদুল ইসলাম, প্রফেসর ড. এম এ মান্নান, অধ্যাপক ড. নুজহাত চৌধুরী, প্রফেসর ড. মামুন-আল মাহতাব, সাবেক মুখ্য সচিব মোঃ নজিবুর রহমান ,প্রফেসর ড. রশিদ আসকারী ,চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম,সাবেক সচিব মিসেস সেলিনা আফরোজ, সাবেক সচিব পবন চৌধুরী, ড. খোন্দকার শওকত হোসেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সাবেক উপাচার্য ড. হারুন-অর-রশিদ, সাবেক সিনিয়র সচিব মোঃ শামসুল আরেফিন, স্থপতি ইকবাল হাবিব, লেখক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাসুদুজ্জামান।








