বিনোদন

‘প্রতিবাদ করলে যতো সাপোর্ট পাই, এর চেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়’

২৫ জুন ভারতীয় স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম হইচইয়ে আসছে আশফাক নিপুণের ওয়েব সিরিজ ‘মহানগর’

চ্যানেল আই অনলাইন এর প্রতিবেদক নির্বাচনী বিশ্লেষণ করছেন. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

নির্বাচনী বিশ্লেষণ ও মতামত প্রকাশ করছেন চ্যানেল আই অনলাইন এর প্রতিবেদক।. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ

সচেতন এবং অনুভূতিপ্রবণ এক সত্তার নাম শিল্পী। প্রকৃত শিল্পী নাকি সময়কে দূরে ঠেলে শিল্প নির্মাণ করতে পারেন না। যিনি সমকালের ঘটনাপ্রবাহ দ্বারা আলোড়িত হন, মুগ্ধ হন কিংবা কখনো কখনো ক্ষুব্ধ ও হন! যা তার সৃজনশীল কাজে প্রতিফলিত হয়। এরকম এক শিল্পী নির্মাতা আশফাক নিপুণ। যিনি তার সমকালকে খুব দারুণভাবে ভিজ্যুয়াল করেন!

এই সময়ের তেমন এক গল্প নিয়ে নিপুণ নির্মাণ করেছেন নিজের প্রথম ওয়েব সিরিজ ‘মহানগর’। শুক্রবার (২৫ জুন) থেকে যা স্ট্রিমিং হবে ভারতীয় ওয়েব প্লাটফর্ম হইচইয়ে। এই সিরিজটির খুঁটিনাটি নিয়েই বুধবার (২৩ জুন) দিবাগত রাতে এই প্রতিবেদকের সাথে মুঠোফোনে আড্ডায় মাতেন নিপুণ:

মহানগর সিরিজের পোস্টার, পুলিশ অফিসার ও সাংবাদিকের ছবি সহ. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ
ওয়েব সিরিজ ‘মহানগর’ এর পোস্টার

আপনার নির্মিত প্রথম ওয়েব সিরিজ ‘মহানগর’। কাজটির অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলুন…
প্রথম ওয়েব কনটেন্ট ‘স্বপ্ননীড়’ বানিয়েছিলাম হইচই এর জন্যই। একই প্লাটফর্মে ‘মহানগর’ আমার প্রথম আন্তর্জাতিক শো (৮ পর্বের ওয়েব সিরিজ)। সিরিজকে শো-ই বলা হয়। আমার বড় একটা কাজ। বর্তমানে ওটিটি কনটেন্টের উত্থান দেখছি। গত একবছরে কয়েকটি ভালো কনটেন্ট আসায় ওটিটি-তে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। তাকদীরের পর বাংলাদেশ থেকে হইচই-এ দ্বিতীয় ওয়েব সিরিজ হতে যাচ্ছে ‘মহানগর’। যেমন উচ্ছ্বাস লাগছে তেমনি কিছুটা চিন্তিত। মানুষ কীভাবে নেয় দেখার অপেক্ষায় আছি।

‘মহানগর’র জন্য আপনার প্রস্তুতি কেমন ছিল?
গত চারমাস এই সিরিজের পেছনে সময় দিয়েছি। রোজার ঈদে ‘মহানগর’ এর জন্য কোনো কাজ করিনি। আবার ঈদ সামনে। আসন্ন ঈদের জন্য কী বানাবো এখনও জানি না। যদিও অন্যদের তুলনায় খুব কম কাজ করি। এখনও ‘মহানগর’ নিয়ে ব্যস্ত। একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে পোস্টের কাজ চলছে। ‘মহানগর’ এর বাইরে অন্য কোনো কাজে মনোযোগ দেইনি। ২১ দিনের মতো শুটিং করেছি। একটি সিঙ্গেল গল্প আটটি এপিসোডে দেখানো হয়েছে। চারটা মাস আমার পুরো টিমকে অনেক বেশি পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

একজন ব্যক্তি ক্যামেরার সামনে প্রতিবাদমূলক ভিডিও তৈরি করছেন. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ
‘মহানগর’ এর শুটিং সেটে নিপুণ

আপনার বেশিরভাগ কাজের সিগনেচার চারপাশের বিভিন্ন অসঙ্গতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো এবং কাজের মাধ্যমে সেটা তুলে ধরা। ‘মহানগর’-এ তেমনটা দেখা যাবে?
সবসময় যে আমি সিরিয়াস কাজ করি এমনটা নয়। বিভিন্ন সেগমেন্ট নিয়ে কাজ করি, যেখানে পারিবারিক ইমোশনাল গল্পও থাকে। কিছু কিছু শিল্পী, পরিচালক আশাপাশের ঘটনা থেকে প্রভাবিত হয়। আমি একটু বেশি পরিমাণে প্রভাবিত হই। এজন্য আমার কাজগুলোতে প্রভাবের ছাপ বেশি। মহানগরেও এমন কিছুটা রয়েছে। এতে ক্রাইমের গল্প বলেছি। ক্রাইম কিন্তু শুধুমাত্র ক্রিমিনাল করে না, এর বাইরেও ক্রাইম করা মানুষ রয়েছে। এসব মিলিয়ে বিভিন্ন অসঙ্গতি থাকবে মহানগরে। শুধু বিনোদনের জন্য বা গল্প বলার জন্য কাজ এখন আর আমার মধ্যে আসে না। কোনো গল্প বললে তার নেপথ্যে শক্ত কোনো কারণ থাকে এবং সেটা আমাদের চারপাশ থেকে কিংবা আমার আইডোলজি বা ক্ষোভ থেকে কিছু বলার চেষ্টা করি।

ফেসবুক পোস্ট বা কাজের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ব্যক্তি জীবনে কখনো অসুবিধায় পড়তে হয়েছে?
বাংলাদেশে আমরা এমন এক ইকো সিস্টেম তৈরি করেছি যদি এখানে ‘সহমত ভাই’ হওয়া যায় তবে সবদিক দিয়ে নিরাপদ। যখনই অন্যরকম চিন্তা বা অসঙ্গতির বিপক্ষে আওয়াজ তোলা হয়, হঠাৎ কিছু মানুষের নজরে পড়তে হয়। এ সমস্যায় এখন থেকে না, শুরু থেকেই পড়তে হয়েছে। শুধু আমাদের দেশে না, বিশ্বব্যাপী কোনো আর্টিস্ট অসঙ্গতি নিয়ে প্রতিবাদ করলে তাকে সমস্যায় পড়তে হয়। যত দিন যাচ্ছে আমাদের প্রতিবাদের ভাষা ও প্রতিবাদীর সংখ্যা সংকুচিত হচ্ছে। কাজের মাধ্যমে বা সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রতিবাদ করলে যতো সাপোর্ট পাই, এর চেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়।

প্রতিবাদে সাপোর্ট পেয়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তা ও একজন যুবক. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ মোশাররফ করিমকে নিয়ে দীর্ঘদিন পর কাজ করলেন। তাকে অভিনেতা হিসেবে কেমন পেয়েছেন?
মোশাররফ ভাইকে নিয়ে এটা আমার প্রথম কাজ বলতে চাই। ১৪ বছর আগে তাকে নিয়ে টিভির জন্য চল্লিশ মিনিটের একটা ফিকশন বানিয়েছিলাম। সেই সময়ে নির্মাতা হিসেবে আমি ম্যাচিউর ছিলাম না, বয়সও অনেক কম ছিল। এখন আমি লিবার্টি নিয়ে বলি, মোশাররফ ভাইকে নিয়ে আমার প্রথম কাজ। মহানগরে ওসি হারুনের চরিত্র করেছেন মোশাররফ ভাই। এটা খুবই কালারফুল এবং বিতর্কিত চরিত্র। চরিত্রটা যখন চিন্তা করি তখন কয়েকজন নয়, শুধু একজনের নামই মাথায় এসেছিল। তিনি মোশাররফ ভাই। বলতে পারি, অনেকদিন পর এ চরিত্রের মাধ্যমে মোশাররফ ভাইয়ের মধ্যে ফ্রেশ পরিবর্তন আসবে। তিনি আমাদের দেশের অন্যতম সেরা অভিনেতা। তাকে নিয়েই এই কাজটি করতে চেয়েছিলাম এবং উনিও ঝাঁপ দিতে রাজি ছিলেন। কাজটা উনি খুবই চমৎকারভাবে করেছেন। পরষ্পরের কাজের অভিজ্ঞতা খুবই ভালো।

ট্রেলারে মোশাররফ করিমকে ‘কিংবদন্তী’ বলায় কিছুটা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। নির্মাতা হিসেবে আপনার ব্যাখ্যা কী?
‘কিংবদন্তী’ বলা নিয়ে বিতর্ক হওয়ার বিষয়টি আমার নজরে খুব বেশি পড়েনি। এই শব্দটা দিয়েছে হইচই থেকে। যেহেতু মোশাররফ করিমের সঙ্গে হইচই এর প্রথম কাজ এবং তার বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া মিলিয়ে তার হিউজ ফ্যান আছে; এ কারণে তারা মোশাররফ করিমকে কিংবদন্তী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। আমাদের দেশে কোনো শিল্পী মারা যাওয়ার পর তাকে লিজেন্ড বলা হয়। বেঁচে থাকতে কোনো বিশেষণ দেই না। কিন্তু ইন্ডিয়াতে বড় আর্টিস্টদের মৃত্যুর আগেই নানাভাবে বিশেষণ দেয়া হয়। অনেক আগে থেকে শাহরুখ খানকে ‘কিং খান’, অমিতাভ বচনকে ‘বিগ বি’ বলা হয়। এটা ইন্ডিয়ানদের স্টাইল। হইচই এর পাশাপাশি আমিও বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সেরা কয়েকজন অভিনেতার কথা হলে সেখানে মোশাররফ করিমের নাম থাকবে। ওনাকে কিংবদন্তী বলা নিয়ে তর্কটা আমার কাছে মোটেও স্বাস্থ্যকর তর্ক মনে হয় না। তিনি গত ২৫ বছর ধরে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করে যাচ্ছেন, তার কাজের স্কেল, জনপ্রিয়তা, ফ্যান বেইজ, দেশের বাইরে কাজের সাফল্য সবকিছু মিলিয়ে তাকে কিংবদন্তী বলাটা আমার কাছে খারাপ লাগে নাই। কিংবদন্তী শব্দটা নামের আগে যোগ হওয়ার পরও মোশাররফ করিম যেমন আছেন, তেমনই থাকবেন, আবার যোগ না করলেও উনার কিছুই আসবে যাবে না। উনি একজন মহৎ শিল্পী, যার কাছ থেকে এখনো অনেক কিছু পাওয়ার আছে আমাদের।

‘মহানগর’-এ মোশাররফ করিম ছাড়াও জাকিয়া বারী মম, শ্যামল মাওলা, লুৎফুর রহমান জর্জ, খায়রুল বাশার, মোস্তাফিজুর নূর ইমরান- তারা কেমন অভিনয় করলেন?
সবসময় বলি, আমি খুব ভাগ্যবান। যাদের সঙ্গে কাজ করি তাদের অন্যভাবে পাই। অনেকেই বলেন, আমার নির্দেশনায় শিল্পীরা এমন অভিনয় করেন যেটা অন্যদের কাজে দেখা যায় না। আমার কখনও এটা মনে হয় না। বাড়তি কিছু যোগ করি না। আমি ক্রেডিট দিতে চাই শিল্পীদের। কারণ, আমি আগে থেকে চিত্রনাট্য দেই না। সেটে বসে চিত্রনাট্য লিখে তাদের হাতে দেই। ‘মহানগর’ আমার জন্য স্পেশাল কারণ, যারা কাজ করেছেন প্রত্যেকের সাথে প্রায় প্রথম কাজ। শ্যামল শুধু ‘কষ্টনীড়’ এ কাজ করেছেন। কিন্তু মম, খায়রুল বাশার, ডিওপি বরকত হোসেন পলাশ, এডিটর, মিউজিক ডিরেক্টর জাহিদ নিরব প্রত্যেকের সঙ্গে আমার প্রথম কাজ। মোট কথা, আমি আমার কমফোর্ট জোনের বাইরে গিয়ে কাজ করলাম। প্রত্যেককে ধন্যবাদ। তারা শতভাগ বিশ্বাস রেখে কাজ করেছেন। তবে আমাকে বিশ্বাস করাটা খুব রিস্ক। কারণ আগে থেকে চিত্রনাট্য দেই না।

‘মহানগর’ নামে সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত সিনেমা রয়েছে। সেই সিনেমার কোনো প্রভাব থাকবে ওয়েব সিরিজে?
সেটি আমার প্রিয় সিনেমাগুলোর একটি। ওই মাস্টারপিস সিনেমার সঙ্গে আমার মহানগরের কোনো তুলনা হয় না। মহানগরের নারীদের নিয়ে সিনেমার গল্প। কিন্তু আমারটা মহানগর সোশ্যাল পলিটিক্যাল গল্প। নাম ছাড়া কোনো মিল নেই। নাম ঠিক করার সময় সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার কথা মনেও ছিল না। তবে তার শততম জন্মবার্ষিকীতে তার সিনেমার নামের সঙ্গে আমার কাজের নাম মিলে যাওয়াকে ‘আনইনটেশনাল ব্রেসিং’ মনে করি।

অফিসে একজন যুবক কর্মী, বই ও ফাইলের পেছনে দাঁড়িয়ে. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ নির্মাণ সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলেন, নিয়মিত কাজ করলে আশফাক নিপুণ ধারাবাহিকভাবে এতো মানসম্মত কাজ হয়তো উপহার দিতে পারতেন না? কথাটি কতোটা সত্য?
তারা যেটা বলে ঠিক বলে। অনেক বেশি কাজ করলে কাজের মান রাখা সম্ভব হতো না। কেউ জোর করে চাইলেই আর্টওয়ার্ক করতে পারবে না। টাকা, নাম কামানো, ভলিউম বাড়ানো জন্য কাজ করলে যেটা অর্জন করতে চাই পারবো না। আবার কম কাজ করলেই যে ভালো কাজ হয় তা নয়। কম কাজ অনেকেই করে, কিন্তু সবার কাজ ভালো হয় না। বছরে ছয় শতাধিক কাজ হয়। দর্শক মনে রাখেন চার পাঁচটি কাজ। তাই সংখ্যা বাড়িয়ে লাভ নেই। কোয়ালিটি রেখে কাজ করলে অনেকদিন টিকে থাকা সম্ভব। দর্শকদের সামনে যখন কাজ দেই আমার কাছে তাদের সময়ের মূল্য অনেক। তার সময় খরচ করে যদি কিছু দিতে না পারি তাহলে তার সময়টা আমি নষ্ট করছি। আমি বিশ্বাস করি, কোনো শিল্প চর্চা অনেক বেশি সংখ্যা দিয়ে করা যায় না। তুলনা নয়, উদাহরণ দিচ্ছি – হেলাল হাফিজের কবিতার বই ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। এটা কিন্তু তার প্রকাশিত একমাত্র বই, আর একটা বই দিয়েই কিন্তু তার নাম সবাই জানে।

বিষয়:অভিনেতা আশফাক নিপুন ওটিটি ওয়েব সিরিজ কিংবদন্তী খায়রুল বাশার

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…