‘ছোটকাকু’কে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান

শিশু-কিশোরদের প্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র ‘ছোটকাকু’। খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগরের সৃষ্ট এই চরিত্র দীর্ঘদিন ধরে গল্প, বই ও টেলিভিশনের পর্দায় শিশু-কিশোরদের কল্পনার জগৎ সমৃদ্ধ করে আসছে। এবার নতুন মোড়কে প্রকাশিত হচ্ছে ‘ছোটকাকু’ সিরিজের ১৪টি বাংলা বই।
১০টি মোড়কের প্রতিটিতে ২টি করে ২০টি রহস্য রয়েছে। একটি বইতে দুইটি প্রচ্ছদে প্রকাশিত হলো এই গ্রন্থগুলো। এছাড়াও ৪টি অনুবাদ ছোটকাকু প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলোর প্রকাশক অন্যপ্রকাশ। বইগুলোর প্রচ্ছদ এঁকেছেন অভিনেতা ও নির্মাতা আফজাল হোসেন। চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হলো বইগুলোর মোড়ক উন্মোচন।
মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ছোটকাকু সিরিজের স্রষ্টা ফরিদুর রেজা সাগর, অভিনেতা আফজাল হোসেন, অন্যপ্রকাশের কর্ণধার মাজহারুল ইসলাম, চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ, অভিনেতা ও নির্মাতা তারিক আনাম খান, চ্যানেল আইয়ের চিফ এক্সিকিউটিভ এডিটর জাহিদ নেওয়াজ খান, কথাসাহিত্যিক ও দৈনিক দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, লেখক ও দৈনিক আগামীর সময়-এর সম্পাদক মোস্তফা মামুন, মাত্রার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সানাউল আরেফিন।
ছোটকাকুর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে অন্যপ্রকাশের কর্ণধার মাজহারুল ইসলাম বলেন,“বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের কাছে ছোটকাকুকে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের কাছে আমরা ছোটকাকুকে নিয়ে যেতে চাই, যে কারণে বাংলার পাশাপাশি আজকে চারটি ইংরেজিতে অনূদিত বইও প্রকাশিত হলো।”
মাজহারুল ইসলাম জানান, ইংরেজির চারটি বইসহ ছোটকাকুকে নিয়ে আজকে প্রকাশিত মোট ১৪টি বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন অভিনেতা, নির্মাতা ও চিত্রশিল্পী আফজাল হোসেন। এ জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানান তিনি।
শিশু-কিশোরদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আনন্দ আলোর সম্পাদক রেজানুর রহমান বলেন, “আমরা খুব গর্ব করে বলি আমাদের ছোটকাকু আছে! শিশু-কিশোরদের জন্য সাগর ভাই-আফজাল ভাইয়েরা কাজ করছে, আমরা অভিভাবকদের বলবো, আপনারা আপনাদের শিশু-কিশোরদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।”
কথাসাহিত্যিক ও দৈনিক দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি আশা প্রকাশ করেন, শিশু-কিশোরদের জন্য ফরিদুর রেজা সাগর আরও ছোটকাকু লিখবেন এবং আফজাল হোসেন চরিত্রটিকে আরও বিস্তৃতভাবে পর্দায় নিয়ে আসবেন।
তিনি বলেন, “আমরা আশা করবো সাগর ভাই শিশু-কিশোরদের নিয়ে ছোটকাকু লেখাটা চালিয়ে যাবেন। আর আফজাল ভাইকে বলবো, আপনি আরো কিছু ছোটকাকু তৈরি করেন।”
মুস্তাফিজ শফি বলেন, ফেলুদার চরিত্রে যেমন বিভিন্ন প্রজন্মের অভিনেতারা অভিনয় করেছেন, তেমনি নতুন প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীদেরও ছোটকাকুর সঙ্গে যুক্ত করা গেলে চরিত্রটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
লেখক ও দৈনিক আগামীর সময়-এর সম্পাদক মোস্তফা মামুন বলেন, বড় হওয়ার পরও শিশুদের কথা ভাবা এবং তাদের জন্য কাজ করে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে ফরিদুর রেজা সাগর ও আফজাল হোসেনের দীর্ঘদিনের কাজের প্রশংসা করেন তিনি।
তিনি বলেন, “আমাদের দেশে যখন কেউ বড় হয়ে যায়, তখন সে ছোটদের কথা ভাবে না। সাগর ভাইয়ের মতো মানুষ এত বড় হয়েছেন, তার পরেও ছোটদের কথা ভেবেছেন- এটা আসলে ছোট-বড় সবার জন্যই আনন্দের বিষয়।”
২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় ছোটকাকু উৎসবের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ছোটদের জন্য ভালো উদ্যোগগুলো তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
তার ভাষায়, “ছোটদের নিয়ে ২৮ ও ২৯ তারিখে ছোটকাকু উৎসব আয়োজন হচ্ছে, এটা দারুণ খবর। কিন্তু সমস্যা হলো ছোটদের জন্য ভালো খবরগুলো ছোটদের কাছে পৌঁছায় না। আমাদের সময়ে ফেলুদা বা দস্যু বনহুর যখন পড়তাম তখন যদি এরকম আয়োজন হতো, তাহলে ঝাঁপিয়ে পড়তাম। ছোটদের নিয়ে আমরা কাজ করেছি, দেখেছি তাদের কাছে আমরা পৌঁছাতে পারছি না। উল্টোভাবে সবকিছু পৌঁছাচ্ছে বলেই কিশোর গ্যাং তৈরী হচ্ছে। ছোটকাকু উৎসব এমন সময়ে হচ্ছে যখন সবকিছু চ্যালেঞ্জিং। এই চ্যালেঞ্জ নেয়ার জন্য ২২ বছর ধরে সাগর ভাই ছোটকাকু লিখছেন, আর আফজাল ভাই ১৫ বছর ধরে পর্দায় সেটা তুলে ধরছেন। তারা নিজেরা ছোট হয়েছেন, ছোটদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন, আমরাও যেন ছোটদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করি।”
নিজেদের শৈশবের কথা স্মরণ করে জাহিদ নেওয়াজ খান বলেন, তখন কচিকাঁচার মেলা, খেলাঘর ও মুকুল ফৌজের মতো সংগঠন ছিল, যেখানে শিশুরা নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতো। এখনকার সময়ের বাস্তবতায় শিশুদের কাছে পৌঁছাতে নতুন ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন,“কিশোর গ্যাংয়ের যে বাড়বাড়ন্ত, এর ব্যর্থতা আমাদের।” তিনি বলেন, “আমাদের ছোটবেলায় কচিকাঁচার মেলা ছিলো, খেলাঘর ছিলো, মুকুল ফৌজ ছিলো- এখন এরকম কিছু নেই। আমাদের সময়ে আমরা খেলাঘর, কচিকাঁচার মেলাতে আমরা লিখতাম- মনে আছে আমরা বুকপোস্টে লেখা পাঠিয়ে অপেক্ষা করতাম, দাদাভাই লেখাটি ছাপলেন কিনা, বা খেলাঘরে লেখাটি ছাপা হলো কিনা! এটা সত্যি যে সময়ের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু এই সময়ে ছোটদের ভালো প্রজন্ম হিসেবে যদি গড়ে তুলতে চাই আমাদেরও সেই অভিনবত্বটা বের করতে হবে। আমরা আশা করি ছোটকাকুর কার্নিভালের মধ্য এরকম উদ্যোগ সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হবে।”
কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক বলেন, ছোটবেলায় রাবেয়া খাতুনের গল্প পড়ে তিনি লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন। এখনকার শিশুরাও ছোটকাকুসহ শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা বিভিন্ন গল্প পড়ে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, “এখন যারা ছোট আছে, তারা নিশ্চয় ছোটকাকু ও কিশোরদের জন্য অন্যান্য যে গল্পগুলো লেখা সেগুলো পড়ে, এবং তাদের হৃদয়ে নিশ্চয় ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে। ছোটকাকুর উৎসবটি সেই ইতিবাচকতা ছড়িয়ে দেবে বলেই আমার বিশ্বাস।”
মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তারিক আনাম খান বলেন, নতুন বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে ছোটকাকুকে ঘিরে নতুন কিছু ঘটেছে। তিনি বলেন, “মোড়ক উন্মোচন হলো মানে আমাদের সামনে নতুন কিছু ঘটলো। বইগুলো ছোট ছোট আকারে বের হয়েছে, এটা দারুণ। আর ইংরেজিতেও বের হয়েছে, সেটা আরো ভালো খবর।”
২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করা ছোটকাকু গোয়েন্দা সিরিজের গল্পে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও প্রান্তিক মানুষের জীবন, প্রকৃতি ও নানা বাস্তবতা উঠে এসেছে। বইয়ের পাতা থেকে টেলিভিশনের পর্দায় জনপ্রিয়তা পাওয়া এই চরিত্রকে এবার নতুন মোড়ক ও ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে আরও বড় পরিসরে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও এসময় জানানো হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আলোকি, গুলশান-তেজগাঁও লিংক রোডে বসবে দুই দিনব্যাপী ‘ছোটকাকু উৎসব ২০২৬’। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি পুরো পরিবারকে নিয়ে এই উৎসবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আয়োজকেরা।







