চীন মিয়ানমারের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত স্ক্যাম সেন্টার পরিচালনাকারী কুখ্যাত মিং পরিবারের ১১ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের একটি আদালত গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে হত্যা, অবৈধ আটক, প্রতারণা ও জুয়া কেন্দ্র পরিচালনাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মিং পরিবারের এসব সদস্যকে দোষী সাব্যস্ত করে। আদালতের রায় অনুযায়ী সম্প্রতি তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
মিং পরিবার ছিল লাউক্কাইং শহর নিয়ন্ত্রণকারী একাধিক শক্তিশালী গোষ্ঠীর একটি। একসময় দরিদ্র এই সীমান্ত শহরটিকে তারা ক্যাসিনো ও যৌনপল্লীসমৃদ্ধ ঝলমলে কেন্দ্রে পরিণত করে। তবে ২০২৩ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো লাউক্কাইংয়ের নিয়ন্ত্রণ নিলে মিং পরিবারের পতন শুরু হয়। ওই সময় তাদের আটক করে চীনের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রতারকদের প্রতি কঠোর বার্তা দিতে চায় বেইজিং। তবে স্ক্যাম ব্যবসা এখন মিয়ানমার–থাইল্যান্ড সীমান্ত, কম্বোডিয়া ও লাওসে সরে গেছে, যেখানে চীনের প্রভাব তুলনামূলক কম।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অনলাইন প্রতারণা চালাতে কয়েক লাখ মানুষ মানবপাচারের শিকার হয়। এর মধ্যে হাজার হাজার চীনা নাগরিক রয়েছেন। প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের বড় অংশও চীনা, যাদের কাছ থেকে বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী স্ক্যাম ব্যবসা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা লাভবান হচ্ছিল বলে ধারণা করা হয়, চীন ২০২৩ সালের শেষদিকে শান প্রদেশে জাতিগত বিদ্রোহী জোটের অভিযানে নীরব সমর্থন দেয়। ওই অভিযানে বিদ্রোহীরা লাউক্কাইংসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করে নেয়।
মিং পরিবার কারা?
মিং পরিবারের এই ১১ সদস্যই মিয়ানমারভিত্তিক স্ক্যাম চক্রের প্রথম নেতা, যাদের চীন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করল। তবে এখানেই শেষ নয়। গত নভেম্বর বাই পরিবারের পাঁচ সদস্যেরও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ওয়েই ও লিউ পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে চলমান মামলার রায় এখনও ঘোষণা হয়নি।
মিং পরিবারের বিচার প্রক্রিয়া ছিল গোপন। তবে গত বছর তাদের সাজা ঘোষণার সময় ভুক্তভোগীদের পরিবারসহ ১৬০ জনের বেশি মানুষকে আদালতে উপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া হয়।
চীনের সর্বোচ্চ আদালতের তথ্যমতে, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মিং পরিবারের স্ক্যাম কার্যক্রম ও জুয়া কেন্দ্র থেকে ১০ বিলিয়ন ইউয়ানের বেশি অর্থ আয় করা হয়। এসব অপরাধে অন্তত ১৪ জন চীনা নাগরিক নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন। আপিল খারিজ করে গত নভেম্বর আদালত এই তথ্য নিশ্চিত করে।
এ ছাড়া মিং পরিবারের আরও ২০ জনের বেশি সদস্যকে পাঁচ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পরিবারের প্রধান মিং শুয়েচাং ২০২৩ সালে গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মহত্যা করেন বলে সে সময় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী জানায়।
গ্রেপ্তার হওয়া সদস্যদের স্বীকারোক্তি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রামাণ্যচিত্রে প্রচার করা হয়, যাতে স্ক্যাম নেটওয়ার্ক নির্মূলে চীনা কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থান তুলে ধরা হয়।
২০০০ দশকের শুরুর দিকে লাউক্কাইংয়ে ‘গডফাদার’সদৃশ কয়েকটি পরিবারের উত্থান ঘটে, যার মধ্যে মিং পরিবার অন্যতম। মিং শুয়েচাং পরিচালিত ‘ক্রাউচিং টাইগার ভিলা’ ছিল শহরের সবচেয়ে কুখ্যাত স্ক্যাম কেন্দ্রগুলোর একটি।
প্রথমে জুয়া ও দেহব্যবসা ছিল তাদের আয়ের প্রধান উৎস। পরে তারা অনলাইন প্রতারণায় জড়ায়, যেখানে অপহৃত ও জোরপূর্বক আটকে রাখা মানুষদের দিয়ে কাজ করানো হতো। উদ্ধার পাওয়া ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্যে জানা যায়, সুরক্ষিত এসব কম্পাউন্ডের ভেতরে নির্যাতন ও সহিংসতা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা; মারধর ও নির্যাতন ছিল নিয়মিত।








