নির্বাচন এলেই দেশের রাজপথে বাড়ে স্লোগান, মিছিল আর ব্যানারের ভিড়। এই ভিড়ের মাঝেই প্রায়ই চোখে পড়ে স্কুলব্যাগ কাঁধে নেওয়ার বয়সী শিশুদের—কারও হাতে দলীয় পতাকা, কারও মুখে রাজনৈতিক স্লোগান। কেউ ব্যানার ধরছে, কেউ মাইক হাতে দাঁড়িয়ে আছে মঞ্চের পাশে। ভোটের রাজনীতিতে শিশুদের এই উপস্থিতি নতুন নয়, কিন্তু প্রশ্ন একটাই—এটা কি তাদের জায়গা?
বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, শিশুবিষয়ক অধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিশুদের ব্যবহার বন্ধের জোরালো দাবি উঠেছে। তারা বলছেন, মিছিল, সমাবেশ, পোস্টার-ব্যানার বহন, স্লোগান দেওয়া কিংবা রাজনৈতিক প্রচারণায় শিশুদের যুক্ত করা শিশু অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন এবং এটি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
শিশু আইন ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৮) এবং ‘জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী শিশুদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ বর্তমানে নির্বাচনী মিছিলে শিশুদের সামনের সারিতে রাখা, উসকানিমূলক স্লোগান দেওয়ানো, পোস্টারিং ও মাইকিংয়ে নিয়োজিত করার মতো ঘটনা ঘটছে। এটি শিশুদের শারীরিক নিরাপত্তা ও মানসিক বিকাশের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের প্রতি প্রশাসনের কঠোর নির্দেশনা জারি করা এখন জরুরি।
শৈশবের বদলে রাজপথ
শিশুদের শৈশব মানে নিরাপত্তা, শিক্ষা আর খেলাধুলা। অথচ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে তাদের নামিয়ে আনা হচ্ছে রাজপথে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার কিংবা স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে শিশুদের এসব কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই, অথচ সামান্য সংঘর্ষ কিংবা সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারাই।
শিশু ও মানব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (আইসিএইচডি)-এর নির্বাহী পরিচালক মাহমুদা আখতার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘শুধুই কি নির্বাচন! প্রায়ই দেখা যায় স্কুলে আমন্ত্রিত অতিথি গেলে তাদের অভ্যর্থনার জন্য রৌদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শিশুদের দাঁড়া করিয়ে রাখা হয়। আমরা আমাদের সুবিধার্থে শিশুদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করছি।’
আইন আছে, প্রয়োগ নেই
বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষা আইন এবং আন্তর্জাতিকভাবে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ—দুটিই শিশুদের রাজনৈতিক শোষণ ও ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার কথা বলে। আইন অনুযায়ী, শিশুদের এমন কোনো কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা যাবে না যা তাদের শারীরিক বা মানসিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবুও বাস্তবে দেখা যায়, আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ প্রায়ই অনুপস্থিত।
বাংলাদেশ শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী কোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিশুদের ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। এই আইন ভঙ্গ করা হলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ পাঁচ লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনকালীন সময় রাজনৈতিক দলগুলো এই বিষয়টিকে ‘গুরুত্বহীন’ হিসেবেই দেখে। ফলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়।
মানসিক ক্ষতির নীরব গল্প
শিশু মনোবিজ্ঞানীদের মতে, রাজনৈতিক সহিংসতার পরিবেশে শিশুদের উপস্থিতি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। ভয়, উৎকণ্ঠা ও আগ্রাসী আচরণ শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। অনেক শিশু এসব অভিজ্ঞতার কারণে পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে কিংবা মানসিক ট্রমায় ভোগে—যার প্রভাব ভবিষ্যতেও থেকে যায়।
মিডিয়া ও নাট্য ব্যক্তিত্ব ত্রপা মজুমদার বলেন, কোনো নির্বাচনেই রাজনৈতিক দলগুলোকে শিশুদের জন্য অঙ্গীকার করতে দেখা যায় না, কারণ শিশুরা ভোটার নয়। কিন্তু এই শিশুরাই ভবিষ্যতের নাগরিক। শিশুদের অধিকার রক্ষায় মিডিয়াকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
দায়িত্ব কার?
এই প্রশ্নে আঙুল ওঠে সবার দিকেই—রাজনৈতিক দল, অভিভাবক, প্রশাসন ও সমাজের। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব সবচেয়ে বড়, কারণ তারাই কর্মসূচির আয়োজক। অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে—শিশুদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের চেয়েও বড়।
নাগরিক সমাজের দাবি, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শুধু সতর্কবার্তা নয়, কঠোর নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেই শিশু ব্যবহারের বিরুদ্ধে স্পষ্ট নীতিমালা কার্যকর করা জরুরি।
শিশু অধিকারকর্মীরা জানান, অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্য, সামাজিক চাপ কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শিশুদের এসব কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। এতে করে তাদের শিক্ষা, স্বাভাবিক বিকাশ এবং মানসিক সুস্থতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
আইসিএইচডি-এর নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক (বেন)-এর ভাইস চেয়ারম্যান মাহমুদা আখতার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘শিশুর নিরাপদ, সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ বেড়ে ওঠাই একটি মানবিক ও টেকসই সমাজের ভিত্তি। শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সমাজে সহিংসতা ও বৈষম্য বাড়ে।’
তিনি বলেন, ঢাকার বিভিন্ন বড় বড় শপিং মল বা কমপ্লেক্সে শিশুদের খেলার জায়গার সঙ্কট। শিশুদের নিয়ে আমাদের কোনো কনসেপ্ট নেই, পাশাপাশি শিশুদের স্পেসও নেই। শিশু বান্ধবতার জন্য বড় ধরণের অ্যাডভোকেসি প্রয়োজন। গণমাধ্যমগুলোতেও শিশু বান্ধবতা প্রয়োজন। শিশু বান্ধবতা গড়ে উঠবে পরিবারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, আদালত ও আইন প্রয়োগে (শিশু আদালত, শিশু ডেস্ক), রাজনীতি ও সামাজিক কার্যক্রমে গণমাধ্যমে (শিশুর ছবি, নাম ও সম্মান রক্ষা)।
যা বলছে মানবাধিকার সংগঠন
মানবাধিবার সংগঠনগুলোর দাবি রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে, যেন কোনোভাবেই শিশুদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার না করা হয়। নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। শিশু সুরক্ষা আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
শিশু ও যুবকদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা কাশফুল ফাউন্ডেশন বলছে, শিশুরা কোনো রাজনৈতিক ব্যানার নয়, প্রচারণার মুখ নয় অথবা ভোটের আবেগ জাগানোর উপকরণও নয়। ফলে রাজনৈতিক প্রচারণা, মিছিল, পোস্টার, ফটোকার্ড কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার কন্টেন্টে শিশুদের সামনে এনে দাঁড় করানো মানে তাদের এমন এক ঝুঁকির ভেতরে ঠেলে দেওয়া, যার দায় তারা বোঝেও না, নিতেও পারে না। এসব ছবি/ভিডিও ব্যবহার শুধু রাজনীতিতেই থেমে থাকে না। গণমাধ্যম যখন যাচাই-বাছাই ছাড়াই সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগ মধ্যমের কন্টেন্ট হিসেবে প্রচার করে, তখন শিশুর ক্ষতির মাত্রা বহুগুণে বেড়ে যায়।
নির্বাচন কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নির্বাচনী কাজে শিশুদের ব্যবহার বন্ধের দাবিটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও মানবিক। শিশুদের রাজনৈতিক কার্যক্রমে ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ এবং এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে সচেতন মহলের মতে, কেবল ঘোষণা নয়—মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক নির্বাচন আয়োজনের জন্য শিশুদের রাজনীতির ঝুঁকিপূর্ণ বলয় থেকে দূরে রাখা অপরিহার্য। শিশুদের স্থান স্কুলে, খেলাধুলায় ও নিরাপদ শৈশবে—রাজনৈতিক সংঘাতের ময়দানে নয়।








