বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতন, যৌন হয়রানি ও বলাৎকারের অভিযোগ সামনে এসেছে, যা শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বৃহস্পতিবার ২৫ জুন বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ)-এর বিগত বছরগুলোর প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি বছরই মাদ্রাসায়, বিশেষ করে কওমি ও আবাসিক মাদ্রাসায় শিশু নিগ্রহের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এসব প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতি বছর দেশে গড়ে শতাধিক এমন ঘটনার প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য সামনে আসে, যা প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত কম। আবাসিক মাদ্রাসা গুলোতে শিশুদের ২৪ ঘন্টা শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এবং কোনো স্বাধীন চাইল্ড প্রটেকশন ডেস্ক বা বাহ্যিক নজরদারি না থাকায়, এসব প্রতিষ্ঠান অপরাধীদের জন্য এক ধরনের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ) এবং বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ডেটা অনুযায়ী, মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা দায়েরের হার অত্যন্ত নিম্নমুখী। লোকলজ্জা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সামাজিক প্রভাব এবং প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে প্রায় ৭০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ ঘটনাই আলোর মুখ দেখে না, স্থানীয় সালিশ বা ঘরোয়া আপসের নামে ধামাচাপা দেওয়া হয়। যা ২০-৩০ শতাংশ ঘটনা থানায় মামলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২ হাজার-এর অধীনে পর্যন্ত গড়ায়, সেগুলোর ক্ষেত্রেও সাজার হার অত্যন্ত হতাশাজনক। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) রেকর্ড এবং বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়া, ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর চাপ এবং সাক্ষীর অভাবে এই সংক্রান্ত মামলার সাজার হার ৫ শতাংশেরও কম। ফলে অপরাধীরা জামিনে বের হয়ে পুনরায় একই অপরাধে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ পায়।
এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের একটি বিশাল অংশের শিশুর ভবিষ্যৎ চরম মানসিক ও শারীরিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানীদের ভাষ্য মতে, এই অপরাধের গ্রাফ নিচে নামাতে হলে শতভাগ মাদ্রাসাকে রাষ্ট্রীয় ও আইনি জবাবদিহিতার আওতায় আনা বাধ্যতামূলক। প্রতিটি মাদ্রাসায় বাধ্যতামূলক সিসিটিভি স্থাপন, চাইল্ড হেল্পলাইন (যেমন: ১০৯ বা ৩৩৩) সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতি ১০০ জন শিক্ষার্থীর জন্য অন্তত একজন স্বাধীন পরিদর্শক বা কাউন্সিলর নিয়োগের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে। একই সাথে আলেম সমাজের একটি বড় অংশকে সম্পৃক্ত করে প্রতিটি মাদ্রাসায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং ইন্টারনাল কমপ্লেইন্ট কমিটি (আইসিসি) গঠন করা জরুরি, যেন পরিসংখ্যানের এই অন্ধকার চিত্রকে স্থায়ীভাবে বদলে দেওয়া সম্ভব হয়।







