বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে শুক্রবার অনুষ্ঠিত হলো ভাবনগর ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘চর্যাপদ পুনর্জাগরণ উৎসব ২০২৫’-এর সমাপনী অনুষ্ঠান। বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দীর্ঘ এই আয়োজনে চর্যাপদের গানের প্রশিক্ষণ কর্মশালা, পুনর্জাগরণের আসর এবং উৎসবের সমাপনী আয়োজন সম্পন্ন হয়।
দিনব্যাপী এই আয়োজনের প্রথম অংশে ছিল চর্যাপদ গানের প্রশিক্ষণ কর্মশালা। এতে প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন সাধিকা সৃজনী তানিয়া, যিনি আদিভাষায় পরিবেশন করেন কাহ্নুপা রচিত চর্যাপদের ১০সংখ্যক পদ; শাহ আলম দেওয়ান, যিনি সমকালীন বাংলায় পরিবেশন করেন ১১সংখ্যক পদ; এবং বাউল অন্তর সরকার, যিনি উপস্থাপন করেন অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান রচিত একটি চর্যা-গীতি। কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাধকশিল্পীরা ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. কিথ ই কান্তু এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে সন্ধ্যায় শুরু হয় চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের আসর। শুরুতেই সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয় লুইপা রচিত চর্যাপদের প্রথম পদ “কাআ তরুবর”। এরপর একে একে মঞ্চে আসেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত সাধকশিল্পীরা। পরিবেশনায় অংশ নেন চুয়াডাঙ্গার আব্দুল লতিফ শাহ, পাবনার ফকির আবুল হাশেম, সুনামগঞ্জের মণীন্দ্র দাশ, পটুয়াখালীর আনিস মুন্সী, ঝিনাইদহের ফতেহ কামাল, জামালপুরের হেলাল উদ্দিন, কিশোরগঞ্জের অন্ধ আল আমিন সরকার পিপাসী, মানিকগঞ্জের বাউল অন্তর সরকার, বরিশালের শাহ আলম দেওয়ান, নাটোরের ফারুক নূরী, নেত্রকোণার মিনা পাগলী, কিশোরগঞ্জের সিদ্দিক ফকিরসহ অনেকে। সংগীতে সঙ্গত করেন হাসান মিয়া, জাকির চিশতি ও নজরুল ইসলাম রানা।
উৎসবের শেষ অংশে চর্যাপদ গানের পুনর্জাগরণে এক যুগ ধরে বিশেষ অবদান রাখার জন্য সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয় শাহ আলম দেওয়ান ও বাউল অন্তর সরকারকে। পাশাপাশি কর্মশালার অংশগ্রহণকারীদের মাঝে বিতরণ করা হয় সনদপত্র।
সমাপনী ভাষণে কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন, “চর্যাপদের পুনর্জাগরণ কেবল সাংস্কৃতিক চর্চা নয়, এটি বাংলার আত্ম-উপস্থিতির পুনর্পাঠ। সহজিয়া ধারার এই সংগীত র্যাডিকাল মুক্তির ভাষা—যেখানে দেহ, ভাব ও ঈশ্বর একসূত্রে গাঁথা। এই চেতনা থাকলে চর্যাপদ আর ‘এক্সোটিক প্রাচ্য’ হিসেবে দেখা হবে না, বরং তা বাংলার নিজস্ব দর্শন ও চিন্তার ঐতিহ্যে শক্তিশালীভাবে উপস্থিত থাকবে।”
অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়াও তার বক্তব্যে বাংলার প্রাচীন জ্ঞানচর্চার ধারায় চর্যাপদের গুরুত্ব তুলে ধরেন। সমগ্র আয়োজনে ভাবনগর ফাউন্ডেশনের কর্মীদের আন্তরিকতা ও দর্শকদের আগ্রহ চর্যাপদ পুনর্জাগরণে নতুন আশার সঞ্চার করে।








