যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছানোর পরিবর্তে আলোচনা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কানাডা। দীর্ঘদিনের মিত্র দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির এই সিদ্ধান্তকে বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত করে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কার্নি। চুক্তি স্বাক্ষরের কাছাকাছি পৌছেও শেষ মুহূর্তে সরে আসার কারণে এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে কানাডীয়দের বোঝানো যে, দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে কিছু অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নেওয়া প্রয়োজন।
কার্নি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত দাবি করেছে কিন্তু বিনিময়ে খুব কম প্রস্তাব দিয়েছে। তিনি ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে শর্ত পরিবর্তন করে ক্ষমতার খেলা খেলার অভিযোগও তুলেছেন।
তিনি বলেন, আমরা আত্মবিশ্বাসী যে আমরা কানাডার স্বার্থেই এ পদক্ষেপ নিচ্ছি।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে কার্নি বলেন, আপনার ওপর হামলা হলে তবেই আপনি যুদ্ধে আছেন, আমাদের ওপর হামলা হয়েছে।
ফরাসি ভাষায় তিনি আরও বলেন, এই ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য বিরোধ কানাডার ইচ্ছায় শুরু হয়নি। তার ভাষায়, কানাডা শক্তিশালী, কানাডা প্রস্তুত, কানাডা ঐক্যবদ্ধ।
বাণিজ্য বিরোধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা উভয় দেশের অর্থনীতিই ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। মার্কিন শুল্কের কারণে কানাডার ব্যবসা-বাণিজ্যে চাপ বাড়বে। একইভাবে কানাডার পাল্টা শুল্কও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায় প্রভাব ফেলবে।
কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রে যায়। আবার মিশিগান, কেনটাকি, ইন্ডিয়ানা ও ওহাইওসহ বেশ কয়েকটি মার্কিন অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার কানাডা।
ক্ষমতায় আসার সময় কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নি আইস হকির এলবোস আপ শব্দটি সামনে এনেছিলেন, যার অর্থ আক্রমণাত্মকভাবে প্রতিরোধ করা। ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক চাপ ও আমেরিকা ফার্স্ট নীতির বিরুদ্ধে কানাডার হয়ে লড়াই করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন তিনি।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, কানাডীয়দের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে।
অ্যাবাকাস ডেটার এক জরিপে প্রায় ৩৬ শতাংশ কানাডীয় যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের পাল্টা ব্যবস্থা সমর্থন করেছেন। অন্যদিকে লেগারের জরিপে ৫৬ শতাংশ মানুষ বলেছেন, ফেডারেল সরকারের উচিত কঠোর অবস্থানে থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ছাড় না দেওয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কে ক্ষুব্ধ কানাডীয়রা এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ কমিয়ে দিয়েছেন। এর প্রভাবে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটন খাতে প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার বা প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব কমেছে।
কানাডার অধিকাংশ প্রদেশের দোকান থেকে মার্কিন মদ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তও যুক্তরাষ্ট্রের পানীয় শিল্পে বড় প্রভাব ফেলেছে।
মার্কিন সরকারের বাণিজ্য তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইন রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৭৮ শতাংশ কমেছে। এতে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ৩৫৭ মিলিয়ন ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিসটিলড স্পিরিটস কাউন্সিল জানিয়েছে, কানাডার প্রাদেশিক নিষেধাজ্ঞার কারণে মার্কিন স্পিরিটসের রপ্তানি ৭০ শতাংশের বেশি কমেছে।
বাণিজ্য বিরোধে তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত কানাডার প্রদেশগুলোর নেতাদেরও এখন নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিতে হচ্ছে কার্নিকে। শনিবার তিনি প্রাদেশিক নেতাদের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। আপাতত তারাও কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান দেখিয়েছেন।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড ইবি বলেন, যে জাতীয় প্রকল্পে এগিয়ে চলেছি, তার প্রতি আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড বলেন, আমরা এ লড়াই শুরু করিনি, কিন্তু আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি যে আমরাই এ লড়াইয়ে জিতব।
শেষ মুহূর্তে কেন ভেস্তে গেল চুক্তি?
এক সপ্তাহ আগেও মনে হচ্ছিল, ওয়াশিংটন ও অটোয়ার মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গেছে। তবে শেষ মুহূর্তে ঠিক কী কারণে আলোচনা ভেঙে পড়ল, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
কার্নির ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের শেষ মুহূর্তের শর্তগুলো ছিল অন্যায্য, অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক এবং ভবিষ্যৎ চুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করার মতো।
তিনি জানান, এসব শর্তের মধ্যে কানাডার গাড়ি শিল্প নিয়ে দাবি এবং তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে কানাডার বাণিজ্য চুক্তির ওপর অগ্রহণযোগ্য বিধিনিষেধ ছিল।
অন্যদিকে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জামিসন গ্রিয়ার অভিযোগ করেছেন, কানাডা নতুন কিছু দাবি তুলেছে এবং আগে দেওয়া কয়েকটি প্রতিশ্রুতি থেকেও পিছিয়ে গেছে।
এ ছাড়া কানাডীয় সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে, মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকও সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না।
বিরোধীদেরও সমর্থন
সম্ভাব্য অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তির খবর প্রকাশের পর কানাডার কয়েকজন প্রাদেশিক নেতা, শিল্প সংগঠন ও রাজনৈতিক বিরোধী উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাদের কেউ কেউ মনে করেছিলেন, কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাচ্ছেন।
তবে কার্নি বলেছেন, এসব সমালোচনা তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেনি।
অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে পুরো সপ্তাহ নীরব থাকলেও কার্নিকে পাঠানো এক চিঠিতে সতর্ক করেছিলেন, চাপের মুখে করা কোনো চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে একের পর এক ছাড় আদায়ের জন্য আরও উৎসাহিত করবে।
অন্টারিও কানাডার অন্যতম বড় উৎপাদন ও গাড়ি শিল্পের কেন্দ্র হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধে প্রদেশটি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
কনজারভেটিভ বিরোধীদলীয় নেতা পিয়েরে পয়লিয়েভরও বলেছেন, কানাডার শিল্পের ওপর ‘একতরফা’ শুল্ক থাকলে সেটি ভালো চুক্তি হবে না। শনিবার তিনি কার্নির আলোচনা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলেন, কানাডা এমন একতরফা শুল্ক মেনে নিতে পারে না, যা আমাদের দেশের শিল্পভিত্তিকে ধ্বংস করে দেবে।
সামনে আরও বড় অনিশ্চয়তা
আলোচনা ভেঙে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মধ্যকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির চলমান পর্যালোচনাতেও।
এখন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও কানাডাকে অপেক্ষা করতে হবে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তের জবাবে কী পদক্ষেপ নেন।









