নকল ধরতে হঠাৎ কেন্দ্রে গিয়ে ছাদে উঠে কাগজ খোঁজার দিনটা আসলে অনেকটাই পেরিয়ে গেছে। এখন লড়াইটা অনেক বেশি অদৃশ্য, আর তাই আরও জটিল।
নকল প্রতিরোধে মাঠে নেমেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে সভা-সমাবেশে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দিচ্ছেন- ‘আর নকল চলবে না।’ বক্তব্যটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু প্রশ্ন হলো- পাবলিক পরীক্ষায় এখনো কি সেই আগের ধরনের নকল আছে, যেটি ধরতে কেন্দ্রে অভিযান চালালেই ধরা পড়ে?
দুই দশক আগে ফিরে তাকালে চিত্রটা ছিল ভিন্ন। ২০০১ থেকে ২০০৬-সে সময় পাবলিক পরীক্ষা মানেই ছিল নকলের উৎসব। কেন্দ্রজুড়ে ছোট কাগজ, শরীরে লেখা উত্তর, বেঞ্চে খোদাই-সবই ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। প্রতিবাদ করতে গেলে শিক্ষক বা ম্যাজিস্ট্রেটকে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে অনেক। সেই বাস্তবতায় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে এহছানুল হক মিলন কঠোর অবস্থান নেন। হঠাৎ কেন্দ্র পরিদর্শন, অপ্রত্যাশিত তল্লাশি-এসব উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মনে ভীতি তৈরি করে এবং নকলের বিরুদ্ধে একটি সামাজিক বার্তা প্রতিষ্ঠা করে।
কিন্তু সময় বদলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে-নকল কি বন্ধ হয়েছে, নাকি শুধু রূপ বদলেছে?
মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে- নকল এখনও আছে, তবে তা আর দৃশ্যমান নয়। এখন আর কেউ পকেটে চিরকুট নিয়ে যায় না, দেয়ালে লিখে না। বরং প্রযুক্তির সহায়তায় পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়। ২০১৬ থেকে ২০১৮- প্রায় প্রতিটি বড় পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠে। এমনকি প্রশ্ন ফাঁসকারীদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণাও করা হয়েছিল। তবুও সমস্যা পুরোপুরি থামেনি।
তাহলে মূল প্রশ্ন-কেন্দ্রে গিয়ে নকল ধরা কি এই নতুন বাস্তবতায় কার্যকর সমাধান?
উত্তরটা সহজ নয়, তবে স্পষ্ট-আংশিক। কেন্দ্র পরিদর্শন পরীক্ষার পরিবেশ বোঝার জন্য জরুরি, কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর নকল প্রতিরোধে এটি যথেষ্ট নয়। যখন পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন বাইরে চলে যায়, তখন কেন্দ্রের ভেতরে শৃঙ্খলা বজায় রাখলেই সমস্যার সমাধান হয় না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-প্রশ্নফাঁসের উৎস কোথায়? কারা এই চক্রে জড়িত? অতীতে দেখা গেছে, প্রশ্ন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার ভেতর থেকেই তথ্য বাইরে চলে যায়। যদি এই জায়গাগুলো নিরাপদ না করা যায়, তাহলে কোন পদক্ষেপই কাজে আসবে না।
শুধু তাই নয়, নম্বর বাড়ানো বা জিপিএ কেনাবেচার মতো অভিযোগও একসময় বড় বিতর্ক তৈরি করেছিল। প্রশ্ন হচ্ছে-এসব অনিয়ম ঠেকাতে এখন পর্যন্ত কী কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বাস্তবতা হলো-কোচিং নির্ভরতা। অভিভাবকদের একটি বড় অংশ এখন স্কুলের চেয়ে কোচিংকেই বেশি গুরুত্ব দেন। এতে করে বিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা কমছে। প্রশ্ন হচ্ছে- শিক্ষার মূল কেন্দ্র যদি বিদ্যালয় না হয়, তাহলে পরীক্ষার সততা কীভাবে নিশ্চিত হবে?
তবে ইতিবাচক উদ্যোগও আছে। পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপন, রেকর্ড সংরক্ষণ-এসব পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। কিন্তু আবারও প্রশ্ন-এগুলো কি প্রযুক্তিনির্ভর নকল ঠেকাতে যথেষ্ট? কারণ বাস্তবতা আরও কঠিন। চাকরির পরীক্ষা, ভর্তি পরীক্ষা-সব জায়গায় এখন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে নকলের ঘটনা ধরা পড়ছে। কানে ক্ষুদ্র ডিভাইস, বাইরে থেকে উত্তর সরবরাহ-এসব প্রমাণ করে নকল এখন আরও উন্নত, আরও সংগঠিত।
তাহলে সমাধান কী? সমাধান একমাত্র সমন্বিত ও আধুনিক ব্যবস্থায়। প্রশ্ন প্রণয়ন থেকে বিতরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল নিরাপত্তার আওতায় আনতে হবে। প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে প্রযুক্তিকেই ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং অভিভাবকদের সমন্বিত ভ‚মিকা নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ প্রশ্ন- এই লড়াই কি জেতা সম্ভব? উত্তর- সম্ভব, তবে পদ্ধতি বদলাতে হবে। শুধু অতীতের কৌশল দিয়ে বর্তমানের সমস্যার সমাধান করা যাবে না। যদি এখন থেকেই আধুনিক, বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তাহলে নকলমুক্ত পরীক্ষার পরিবেশ গড়া অসম্ভব নয়।
আর সেটাই হবে সবচেয়ে বড় সাফল্য-শুধু একজন মন্ত্রীর নয়, পুরো একটি প্রজন্মের।








