এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পরাজিত হয়েছেন কমলা হ্যারিস। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হ্যারিসের পরাজয়ের পেছনে অর্থনৈতিক অবস্থা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং তার প্রশাসনের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। কমলা হ্যারিস কোথায় ভুল করেছেন এবং তিনি আর কী করতে পারতেন তা নিয়ে চলছে আলোচনা।
বিবিসি জানিয়েছে, পরাজয় নিশ্চিতের পর হ্যারিস প্রচারাভিযানের সদস্যরা বুধবারের প্রথম দিকে নীরব ছিলেন। অনেকেই আশা করেছিলেন হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ বড় ব্যবধানেই জয়ী হন। এতে হতাশ হয় ডেমোক্র্যাটিক শিবির। দলটির ভবিষ্যৎ নিয়েও আঙুল তুলছেন অনেক। হ্যারিসের প্রচারণা দলের ম্যানেজার জেন ও’ম্যালি ডিলন বুধবার কর্মীদের কাছে একটি ইমেল বার্তায় বলেছেন, পরাজয় অসম্ভব বেদনাদায়ক। এটা কঠিন। এটি মেনে নিতে অনেক সময় লাগবে।
অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে হ্যারিস নিজেকে খুব একটা আলাদা করে তুলে ধরতে পারেনি এবং ভোটারদের বোঝাতে পারেনি যে তিনি ব্যাপক অর্থনৈতিক উদ্বেগের মধ্যে যে পরিবর্তনটি দরকার তা এনে দিতে পারেন। তার প্রচারণা কৌশল তার পরাজয়ে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে।
নির্বাচনী দৌড় থেকে বাইডেন সরে দাঁড়ানোর পর হ্যারিস কোন ধরণের যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রেসিডেন্ট পদের টিকিট পেয়ে যান। তিনি তার মাত্র ১০০ দিনের প্রচারাভিযান শুরু করেছিলেন নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব, মহিলাদের গর্ভপাতের অধিকার নিয়ে সমাবেশ, ক্রমবর্ধমান খরচ এবং আবাসন সমস্যা সমাধানসহ অর্থনৈতিক বিষয়গুলোতে শ্রমজীবী ভোটারদের নানান প্রতিশ্রুতি দেয়ার মাধ্যমে।
ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ল্যারি সাবাতো বলেন, ডেমোক্রেটিকদের এ বিপর্যয়ের দায় বেশির ভাগটাই জো বাইডেনের। বাইডেনের নতুন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেষ্টা করা উচিত হয়নি। হ্যারিসকে কম সময়ের মধ্যে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হয়েছে, যা অপর্যাপ্ত ছিল।
অনেক তারকা, নারী ও তরুণ সমাজ তাকে সমর্থন দিলেও জনগণের মধ্যে থাকা বাইডেন বিরোধী মনোভাব তিনি মুছে ফেলতে পারেননি। অনেকের মধ্যেই বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে রয়েছে তীব্র ক্ষোভ। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার বলেছেন, যে তারা বিশ্বাস করেন, বাইডেনের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্র ভুল পথে রয়েছে। যদিও হ্যারিস বাইডেন প্রশাসনের ছায়া নিজের ওপর না পড়তে দেয়ার অনেক চেষ্টা করেছেন। হ্যারিস তার প্রচারাভিযানের বলেছেন, তার প্রশাসন বাইডেনের প্রশাসনের ধারাবাহিকতা হবে না। তবে তিনি স্পষ্টভাবে তার নিজস্ব নীতির রূপরেখা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
কমলা হ্যারিস কেন দেশটির নেতৃত্ব দেবেন এবং কীভাবে তিনি অর্থনৈতিক হতাশা এবং অভিবাসন নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগগুলো পরিচালনা করবেন সে সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি দিতে ব্যর্থ হন। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১০ জনের মধ্যে ৩ জন ভোটার বলেছেন যে তাদের পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি পিছিয়ে যাচ্ছে। ১০ জনের মধ্যে নয়জন ভোটার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে খুব বা কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলেন। ১০ জনের মধ্যে ৪ জন ভোটার বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বসবাসকারী অভিবাসীদের তাদের মূল দেশে নির্বাসিত করা উচিত।
হ্যারিসের প্রচারাভিযান দল আশা করেছিল, যে ভোটাররা ২০২০ সালে বাইডেনকে জয়ী করছে তার এবার হ্যারিসকে ভোট দিবে। এর সাথে যুক্ত হবে কলেজ ও শিক্ষিত ভোটাররা। কিন্তু ভোটের ক্ষেত্রে তা হয়নি। আবার মহিলারা মূলত ট্রাম্পের বিরুদ্ধে হ্যারিসকে সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু ভোটের ফলে দেখা গেছে, শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের একটি বড় অংশ তাকে ভোট দেননি।
সুপ্রিম কোর্ট গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার বাতিল করার পর প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা আশা করেছিল যে গর্ভপাত অধিকারের লড়াইয়ে তাদের মনোযোগ বিজয় এনে দিবে। যদিও প্রায় ৫৪ শতাংশ মহিলা ভোটার হ্যারিসের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তবে তা ২০২০ সালের থেকে ৩ শতাংশ কম।
ইউনিভার্সিটি অব রিচমন্ড স্কুল অব ল-এর অধ্যাপক কার্ল টোবিয়াস মনে করেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের পেছনে অভিবাসন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাইডেন-কমলা প্রশাসনের মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে আসা লাখ লাখ অভিবাসীকে বিতাড়িত করার জন্য বড় ধরনের অভিযান চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ট্রাম্প।
প্রবীণ রিপাবলিকান পোলস্টার ফ্র্যাঙ্ক লুন্টজ বলেন, কমলা হ্যারিসের এই নির্বাচনে হেরে যাবার অন্যতম কারণ হল, তিনি প্রায় একচেটিয়াভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আক্রমণ করায় মনোনিবেশ করেছিলেন। তিনি বলেন, ভোটাররা ইতিমধ্যেই ট্রাম্প সম্পর্কে সবকিছু জানেন। তারা এখন হ্যারিসের প্রশাসনের প্রথম ঘণ্টা, প্রথম দিন, প্রথম মাস এবং প্রথম বছরের পরিকল্পনা সম্পর্কে আরও জানতে চেয়েছিলেন। হ্যারিসের নিজস্ব ধারণার চেয়ে ট্রাম্পের ওপর ফোকাস করা তার প্রচারণার জন্য এটি একটি বিশাল ব্যর্থতা ছিল।








