বৃহস্পতিবার ২৬ ফেব্রুয়ারি, ভোরের সেহরির শেষ মুহূর্ত। বাইরে তখনও অন্ধকারের কোমল আবরণ। ঘরে হয়তো কেউ পানি খাচ্ছিল, কেউ নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কেউ আবার আধোঘুমে। ঠিক সেই সময়, একটি বিকট শব্দ। তারপর আগুন।
মুহূর্তেই একটি পরিবারের স্বাভাবিক সকাল পরিণত হয় বিভীষিকায়। রান্নাঘরে জমে থাকা গ্যাসের বিস্ফোরণে পুরো বাসা গ্রাস করে লেলিহান শিখা। একই পরিবারের নয়জন দগ্ধ হন। যে ঘর ছিল নিরাপত্তার আশ্রয়, সেটিই হয়ে ওঠে দহনক্ষেত্র।
দগ্ধদের প্রথমে নেওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত স্থানান্তর করা হয় ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট-এ। চিকিৎসকেরা জানান, কয়েকজনের শরীরের বড় অংশ পুড়ে গেছে। ইতোমধ্যে পাঁচটি প্রাণ নিভে গেছে। বাকিরা জীবন ও মৃত্যুর সূক্ষ্ম সীমানায় ঝুলে আছেন।
আগুনের ভেতর এক শিশুর আর্তি দগ্ধদের মধ্যে ছয় বছরের আনাস। শিশুটি এখন হাসপাতালের শয্যায়। সাদা ব্যান্ডেজে মোড়া তার ছোট্ট শরীর। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তবু মাঝেমধ্যে আধখোলা চোখে চারপাশে তাকায়। তার ঠোঁট কাঁপে। খুব আস্তে, খুব ভাঙা স্বরে ডাকে,
“আম্মু…
এই ডাকের কোনো উত্তর নেই। যে মায়ের কোল ছিল তার নিরাপদ পৃথিবী, যে আঁচলে লুকিয়ে সে ভয় ভুলে যেত,সেই আশ্রয় আজ নেই। হাসপাতালের কাঁচঘেরা বার্ন ইউনিটে আনাসের চোখে শুধু এক অজানা খোঁজ। হয়তো সে বুঝতে পারছে না কী হয়েছে। শুধু জানে, তার মা পাশে নেই।
স্বজনরা বলেন, জ্ঞান ফিরলেই সে একই প্রশ্ন করে,আম্মু কোথায়?কেউ উত্তর দিতে পারেন না।কারণ উত্তরটা খুব নির্মম।
আনাসের মামা চোখ মুছতে মুছতে বলেন,
“ও শুধু ‘আম্মু’ বলে ডাকছে। আমরা কীভাবে বলব যে ওর মা আর ফিরবে না? একটা ছয় বছরের বাচ্চাকে এই কথা কীভাবে বুঝাই? ”তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে।
“আগুন শুধু মানুষ পোড়ায় না, পুরো পরিবার পুড়িয়ে দেয়। আমরা শুধু চাই,এই শিশুটাকে যেন বাঁচানো যায়। অন্তত ও যেন আরেকবার হাসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, যদি অবহেলা বা গ্যাস লাইনের ত্রুটি থেকে এই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে, তবে তার জবাবদিহি চাই।
“একটা ছোট ভুলের মূল্য যদি হয় পাঁচটা প্রাণ, তাহলে এই দায় এড়ানোর উপায় নেই।”
হালিশহরের সেই বাসায় এখন শুধু পোড়া গন্ধ। দেয়ালে কালো দাগ, ছাই হয়ে যাওয়া আসবাব, আর নীরবতা।
যে ঘরে সেহরির আলো জ্বলছিল, সেখানে এখন শোকের ছায়া।
একটি বিস্ফোরণ শুধু ইট-পাথর ভাঙেনি,ভেঙেছে স্বপ্ন, ভেঙেছে নিরাপত্তা, ভেঙেছে একটি শিশুর নির্ভরতার পৃথিবী।
ঢাকার হাসপাতালের শয্যায় ছোট্ট আনাস আজও আধখোলা চোখে খুঁজে ফেরে তার ‘আম্মু’কে।
পোড়া শরীরের ব্যথার চেয়েও হয়তো গভীর তার না-পাওয়ার যন্ত্রণা।
হালিশহরের এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, একটি সামান্য গ্যাস লিক কত দ্রুত রূপ নিতে পারে জীবন্ত ট্র্যাজেডিতে।
আর সেই ট্র্যাজেডির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক শিশুর নিঃশব্দ আর্তি
“আম্মু…”








