মালদ্বীপে নতুন-পুরোনো মিলিয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ বাংলাদেশি প্রবাসী বর্তমানে নানা কষ্টে দিন পার করছেন। রাজধানী মালেতে বাংলাদেশি শ্রমিকের চাহিদা কমে আসছে, অন্যদিকে ভারতীয় ও নেপালি শ্রমিকদের চাহিদা ও বেতন দুটোই বাড়ছে। যেখানে একজন ভারতীয় বা নেপালি শ্রমিক শুরু থেকেই অন্তত ৪০০ ডলার বেতন পান, সেখানে বাংলাদেশিরা শুরুতে পান মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ ডলার।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ১০ মাস কাজ করলেও ৫ মাসের বেতন বকেয়া থাকে। ফলে বেতনের আশায় নিজের জমানো টাকা ভেঙে জীবন চালাতে হচ্ছে অনেককে।
মালদ্বীপ প্রবাসীদের অনেকেই বলছেন, তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা নেমে এসেছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী জীবনযাপন করতে পারছেন না তারা।
হতাশা, অনিশ্চয়তা আর অবহেলার অভিযোগ
এক প্রবাসীর ক্ষোভ, “আমরা প্রবাসে এসে যতটা অবহেলার শিকার হচ্ছি, কেউ খবর নিচ্ছে না। ২৫০ ডলার বেতনে কী খাব, আর বাড়িতে কী পাঠাব? সপ্তাহে দুই দিন কাজ পাই। পুলিশের কাছে গেলেও কাজ হয় না, তারা মালিকের পক্ষ নেয়।”
অনেকেই ৬–৭ মাস ধরে কাজ না পেয়ে দেশে থেকে টাকা এনে খাওয়া-দাওয়ার খরচ চালাচ্ছেন একটা ভালো দিনের আশায়।
দালাল চক্রের ফাঁদে স্বপ্নভঙ্গ
গাজীপুরের রহমান ছয় মাস আগে মালদ্বীপে আসেন। ৫ লাখ টাকা খরচ করে আসার পরও এখনো কোনো স্থায়ী কাজ পাননি।
তিনি বলেন, “৪০ হাজার টাকা বেতনের কথা বলে এনেছে, কিন্তু এসে দেখি ফ্রি ভিসা। কাজ নাই। কয়েকদিন কাজ করলেও টাকা পাই না। আবার কাজ পেতে হলে ১ থেকে ৩ হাজার রুফিয়া পর্যন্ত দিতে হয়।”
এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই। দালালদের দৌরাত্ম্যে প্রবাসীদের জীবন হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত।
বেতন বকেয়া, কোটি টাকার ক্ষতি
কুমিল্লার নুরুল হাসান তিন বছর ধরে মালেতে আছেন। চুক্তিভিত্তিক কাজ করলেও নিয়মিত বেতন পান না। বিভিন্নভাবে তার প্রায় ১৫ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
আইনি জটিলতা ও ভয়
হোটেলকর্মী বিল্লাল হোসেন, দুই বছর ধরে মালেতে আছেন। তিনি বলেন, “একদিকে কাজ নাই, অন্যদিকে পুলিশ ও ইমিগ্রেশনের অভিযান। কাগজপত্র ঠিক থাকলেও অন্য জায়গায় কাজ করলে ধরা পড়লে দেশে ডিপোর্ট করে।”মালদ্বীপের আইনে একজন শ্রমিক তার নির্ধারিত মালিক ছাড়া অন্য কোথাও কাজ করতে পারলে শাস্তির মুখে পড়েন—যা অনেকের জন্য বড় সংকট তৈরি করছে।
কোটা ও ভিসা বাণিজ্য নিয়ে প্রশ্ন
নতুন শ্রমিক হাসান জানান, “লোক লাগবে ৫ জন, কিন্তু দালাল নিয়ে এসেছে ১০ জন। তিনজনের কোটায় ১০ জন আসে কীভাবে—এখানে কি গাফিলতি নেই?”
আরেক প্রবাসী কামাল বলেন, সরকারি ভিসার খরচ যেখানে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা, সেখানে দালালরা নিচ্ছে ৪ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু কাজের নিশ্চয়তা নেই।
অনেকের অভিযোগ, স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী কোটা নিয়ে ফ্রি ভিসায় শ্রমিক এনে কাজ না দিয়ে বসিয়ে রাখছে। এতে করে একদিকে আইনগত বাধা, অন্যদিকে কাজের সংকট—দুই দিকেই চাপে পড়ছেন প্রবাসীরা।
সরকারের প্রতি আবেদন
প্রবাসীদের দাবি, বাংলাদেশ সরকার যদি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতো, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারত।
তাদের আকুল আবেদন, প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক এবং দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
সব গল্প এক নয়
মালদ্বীপে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন, তারা ভালো আছেন। শেষ পর্যন্ত সত্যটা হলো সুখ-দুঃখ, আশা-হতাশা মিলিয়েই প্রবাসজীবন। মালদ্বীপে বাংলাদেশিদের জীবনও তার ব্যতিক্রম নয়।







