বাংলাদেশের ক্রিকেটে দুই তারকা সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। এক সময়ে খুব ভালো বন্ধু থাকলেও দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন তারা। ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে থেকেই দৃশ্যমান বিষয়টি। যার উত্তাপ দেখা গেছে চলতি বিপিএলেও। মাঠে ও মাঠের বাইরের নানান ঘটনায় উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন দুজনেই। এবার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়েও মুখোমুখি হচ্ছেন তারা।
সোমবার এলিমিনেটর ম্যাচে চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সকে ৭ উইকেটে হারিয়ে কোয়ালিফায়ার নিশ্চিত করেছে তামিমের বরিশাল। অন্যদিকে প্রথম কোয়ালিফায়ারে লিটন দাসের কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের কাছে ৬ উইকেটে হেরে গেছে রংপুর রাইডার্স। এই দুই দল দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ার ম্যাচে মুখোমুখি হবে। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে দেখা যাবে সাকিব-তামিম দ্বৈরথ। বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ছটায় মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে গড়াবে লড়াই।
ভারতে হয়া বিশ্বকাপের আগে দুই ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের বিষয়টি সামনে আসে। পরে তামিমের খেলা নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছিলেন সাকিব। তামিমও জবাব দিয়েছেন। পরে একে-অপরের পাল্টাপাল্টি নানা বক্তব্যে জন্ম নিয়েছে আলোচনা। এক সময়ের কাছের দুই বন্ধুর কথা বলাও বন্ধ। সামনে পেয়েও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কেউ কারো সাথে কথাও বলেননি। বিপিএলে লিগপর্বের প্রথম লেগে ম্যাচ শেষে সৌজন্যমূলক হাত মিলিয়েছেন দুজনেই, তবে কথা হয়নি।

তবে রংপুর-বরিশালের মধ্যকার দ্বিতীয় লেগের ম্যাচে বেড়েছে আরও উত্তেজনা। তামিমকে ফিরিয়ে স্বভাবসুলভ উদযাপন করেছিলেন সাকিব। রংপুরের ব্যাটিংয়ের সময় সাকিবকে ফেরান মেহেদী হাসান মিরাজ। বদলি খেলোয়াড় হিসেবে ফিল্ডিংয়ে নামা প্রীতম কুমারের হাতে ক্যাচ দেন সাকিব। ক্যাচ তালুবন্দির পর সাকিবের উদযাপনের পুনরাবৃত্তি করেন তামিম। বরিশাল অধিনায়কের এমন উদযাপনের পরে দুজনের দ্বন্দ্বটাই প্রকাশ পেয়েছে।
ক্রিকেটীয় দিক থেকেও ম্যাচে দুজনের জমজমাট হতে পারে বেশ। ছন্দে আছেন সাকিব-তামিম দুজনেই। ১৩ ইনিংসে ৪৪৩ রান করেছেন তামিম, আসরে এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংগ্রহ এটি। অন্যদিকে ব্যাটে-বলে আলো ছড়িয়েছেন সাকিব। ব্যাট হাতে ২৫৪ রানের পাশাপাশি বল হাতে নিয়েছেন ১৭ উইকেট। অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে টুর্নামেন্ট সেরার অন্যতম দাবিদার সাকিব। দুজনের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সও ম্যাচের ফলাফলে রাখতে পারে বড় ভূমিকা।
চলতি আসরে লিগপর্বে নিজেদের প্রথম দেখায় ৫ উইকেটে জয় পেয়েছিল বরিশাল। দ্বিতীয় দেখায় অবশ্য ১ উইকেটে জয় পেয়েছে রংপুর। সাকিব-তামিমের দ্বৈরথের পাশাপাশি হাইভোল্টেজ ম্যাচটিতে দু’দলই শক্তিশালী। একদিকে সাকিব আল হাসান, ইমরান তাহির, জিমি নিশাম, নিকোলাস পুরান, ফজলহক ফারুকী, হাসান মাহমুদ, শেখ মেহেদীরা আছেন রংপুরে। অন্যদিকে তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মেহেদী হাসান মিরাজ, সৌম্য সরকার, সাইফউদ্দীন, ডেভিড মিলার, কাইল মায়ার্সরা আছেন বরিশালে।

দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে নামার আগে অবশ্য লড়াইটা সাকিব-তামিমের মধ্যে নয় বরং বরিশাল-রংপুরের লড়াই হিসেবে দেখছে দলদুটি। তামিম-সাকিবের লড়াই নয়, মাঠের পারফরম্যান্সকেই উপভোগ করেন বরিশাল কোচ মিজানুর রহমান বাবুল। বলেছেন, ‘আমরা আমাদের নিজেদের খেলাটা উপভোগ করার চেষ্টা করি। তখন সাকিব বা তামিমের বিষয়টা আমাদের মাথায় আসে না। আমরা যে টিমে কাজ করি, আমি চাই তামিম বেস্ট ক্রিকেট খেলুক, আমার টিম জিতুক, আমি তখন ওটাই উপভোগ করি। অবশ্য দুজনেই বাংলাদেশের সেরা প্লেয়ার, দুইজন দুই টিমে খেলে, দুজনেই চাইবে নিজেদের টিমকে জেতাতে। এই আসরে দুজনেই ভালো ক্রিকেট খেলছে। যার টিম ভালো খেলবে তার টিম জিতবে।’
বিপিএলে শুরুর দিকে ছন্দ হারালেও শেষের দিকে ছন্দে ফিরেছে বরিশাল। শেষ চারটি ম্যাচে পরাজয়হীন তারা। সেটাকেই অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখছেন বরিশাল কোচ। বলেছেন, ‘আমরা একটা ভালো মোমেন্টাম পেয়েছি। শুরুর দিকে যে অবস্থা ছিল তার চেয়ে টিম এখন ভালো অবস্থানে আছে, সবাই ভালো খেলছে। আমরা জিততে চাই।’

পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থেকেই প্লে-অফ নিশ্চিত করেছিল রংপুর রাইডার্স। যদিও প্রথম কোয়ালিফায়ারে কুমিল্লার কাছে হেরে গেছে তারা। দুর্দান্ত খেলতে রংপুরকে নিজেদের সমমান দল হিসেবেই দেখছেন বাবুল। বলেছেন, ‘দুটা টিমেরই একইরকম স্ট্রেন্থ। অলমোস্ট সেমিফাইনালের মত, যারা ভালো খেলবে তারাই জিতবে। এখানে কোনো ছোট-বড় টিম নেই এখন আর।’
সাকিব-তামিমের দ্বৈরথ নিয়ে বরিশাল কোচের সঙ্গে একবিন্দুতে রংপুর কোচ সোহেল ইসলামও। বললেন, সাকিব-তামিম ইস্যুতে গভীরে যেতে চান না তিনি।
‘ব্যক্তিগত ইস্যু নিয়ে আমার বলার কিছু নেই। এটা নিয়ে একদমই চিন্তা করি না। আমার দল নিয়ে চিন্তা করি। দলের মধ্যে সেও (সাকিব) একটা অংশ। প্রতিপক্ষ দলে যে (তামিম) আছে, সেও তাদের দলের অংশ। দলের পারফরম্যান্সে ক্রিকেটার কীভাবে প্রভাব রাখতে পারবে, সেটা নিয়েই চিন্তা করি। ব্যক্তিগত ইস্যু নিয়ে চিন্তা করার কোনো সুযোগ নেই এখানে।’

শীর্ষে থেকে লিগপর্ব রংপুর অবশ্য হেরেছে নিজেদের সবশেষ দুই ম্যাচে। পরপর দুই পরাজয়ের কারণে কিছুটা চাপেই থাকার কথা রংপুরের। প্রথম কোয়ালিফায়ারে ১৮৫ রান করেও আটকাতে পারেনি কুমিল্লাকে। পরাজয়ের পেছনে দলের কিছু ঘাটতির কথা মানছেন রংপুর কোচ। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে চান তারা।
‘ক্রিকেট খেলায় চাপ থাকবে না, তা তো হতে পারে না। বিপিএলের মতো টুর্নামেন্টে প্লে-অফ পর্বের খেলা চলছে, চাপ থাকবেই। আর এটা জয় করেই খেলতে হবে। সবশেষ ম্যাচে আমরা ভালো স্কোর করেছি তবে বোলিংয়ে কিছু জায়গায় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। ওই ম্যাচ নিয়ে আর ভাবছি না। সামনের ম্যাচ নিয়ে চিন্তা করছি। সবশেষ ম্যাচ থেকে তো শিখেছি, আমাদের কোথায় উন্নতি করতে হবে। সেগুলো নিয়েই ছেলেদের সঙ্গে কথা হচ্ছে। আমরা শক্তভাবে ঘুরে দাঁড়াতে চাই। এখন তো আর কোনো বিকল্প নেই।
বরিশালকে হারাতে পারলে প্রায় সাত বছর পর ফাইনালের মঞ্চে পৌঁছাবে রংপুর। ২০১৭ সালে সবশেষ ফাইনাল খেলেছিল তারা। ঢাকা ডায়নামাইটসকে হারিয়ে বিপিএলে নিজেদের একামাত্র শিরোপাও জিতেছিল তারা। অন্যদিকে রংপুরের বাধা পেরুতে পারলে আরও একবার ফাইনালের টিকিট কাটবে বরিশাল। সবশেষ ২০২২ সালে ফাইনালে খেলেছিল তারা। সেবার কুমিল্লার কাছে মাত্র ১ রানে হেরে শিরোপা স্বপ্নভঙ্গ তাদের। অবশ্য আরও দুবার ফাইনাল খেলেছিল বরিশাল, তবে ভিন্ন নামে। ২০১২ সালে বরিশাল বার্নাস, সেবারও রানার্সআপ হয়েছিল ঢাকা গ্লাডিয়েটর্সের কাছে হেরে। আর ২০১৫ বরিশাল বুলস নামে ফাইনালের মঞ্চে হেরেছিল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের কাছে। চলতি আসরে ফাইনালের টিকিট কাটতে পারলে সেই কুমিল্লার মুখোমুখি হবে তারা।







