টমাস স্টেয়ার্ন্স এলিয়ট বা টিএস এলিয়টকে মনে করা হয় বিংশ শতকের অন্যতম প্রতিভাশালী কবি। একই সঙ্গে নাট্যকার ও সাহিত্য সমালোচক। এলিয়ট ১৮৮৮ সালে দক্ষিণ আমেরিকার পুরনো শহর ম্যাসাচুসেপসের মিসৌরির সেন্ট লুইসে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে ১৯১৪ সালে ইংল্যান্ডে চলে যান এবং ১৯২৭ সালে ৩৯ বছর বয়সে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। তিনি এমন সময় বেড়ে উঠেন যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলমান। চারদিকে অস্ত্রের দামামা। সম্পর্কের টানাপোড়েন, মানসিক সংকট, ইংল্যান্ডের নাগরিকদের চোখে মুখে যুদ্ধের আতংক, অনিশ্চয়তা, অসহায়ত্ব ও সর্বোপরি মানবিক সংকট।
‘দ্য লাভ সং অব জে আলফ্রেড প্রুফ্রক’ ও ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ দুটি বিখ্যাত কবিতার জন্য এলিয়ট আমাদের কাছে খুবই পরিচিত। ১৯১৫ সালের দিকে ‘দ্য লাভ সং অব জে আলফ্রেড প্রুফ্রক’ -এর মাধ্যমে সবার নজর কাড়েন এলিয়ট। দ্য হলো মেন (১৯২৫), অ্যাশ ওয়েন্সডে (১৯৩০) এবং ফোর কোয়ার্টার্স (১৯৪৫) তার অন্যতম কাব্যগ্রন্থ। ১৯৪৮ কবিতার জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন এলিয়ট। সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ‘অর্ডার অফ মেরিট’ নামে আরেকটি পুরস্কার লাভ করেন।
অমর একুশে বইমেলায় কবি, সাংবাদিক জাহানারা পারভীন নিয়ে এলেন ‘এবং এলিয়ট’। বইমেলায় হাজারো বইয়ের ভীড়ে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ একটি বই। ইংরেজি সাহিত্যের মহান কবির বিভিন্ন কবিতা ও নাটক বাংলায় অনুবাদ হলেও সম্ভবত এটিই প্রথম গ্রন্থ, যেখানে কবি এলিয়টকে পুরোপুরিভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ৭টি প্রবন্ধ ও ১টি সাক্ষাৎকারে বইটি সন্নিবেশিত।
যেমন দ্য প্রুফক নিয়ে ‘প্রুফক ও পাউন্ড। এ প্রবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে, কীভাবে লেখা হয়েছে ‘দ্য লাভ সং অব জে আলফ্রেড প্রুফ্রক ও আরেক প্রতিভাবান কবি এজরা পাউন্ড এর সঙ্গে এলিয়টের সম্পর্কের বৃত্তান্ত। দ্বিতীয় প্রবন্ধটি হলো- ‘চরকায় কাটা জীবন’। এই নিবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে যুদ্ধোত্তর প্রবাস জীবন, জার্মান, প্যারিস, বেলজিয়াম, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে থাকা এবং কবি হিসেবে যেভাবে আত্মপ্রকাশ। বিয়ে, প্রেম, সমকামিতাসহ নানা বিষয় তৃতীয় প্রবন্ধটির শিরোনাম ‘আড়ালে থাকা ছায়া।’ নির্বাসিত জীবন, শিক্ষকতা, ব্যাংক ও প্রকাশনা সংস্থায় চাকরি, পাওয়া না পাওয়ার বেদনা ইত্যাদি এ নিবন্ধে স্থান পেয়েছে। চতুর্থ অধ্যায়টি হলো- ‘শান্তি শান্তি শান্তি।’ ৩৮ বছরের ছোট ভালেরির সঙ্গে প্রেম, সম্পর্কের টানাপোড়েন ইত্যাদি। পঞ্চম অধ্যায়ের শিরোনাম ‘বেদনার্ত সম্পর্কের নুড়ি।’ ভিভিয়েনের সঙ্গে বিশেষ সর্ম্পকেরও টানাপোড়েন। আরেক দার্শনিক, কবি ব্রান্টার্ড রাসেলের সঙ্গে সম্পর্ক, একসাথে থাকার বিষয়গুলো বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়েছে এই অধ্যায়ে। ষষ্ঠ অধ্যায় হলো ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড পোড়োজমির পাঁচালি’। এই শিরোনামে আলোচনা করা হয় যেভাবে লেখা হলো ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কবিতা এবং যেভাবে আরেক বিখ্যাত কবি এজরা পাউন্ড তা সম্পাদনা করেছেন, কীভাবে ছাপা হয়েছিল এসবের আদ্যোপান্ত। ষষ্ঠ অধ্যায় হলো- ‘মিসিসিপির ছেলে।’ অর্থ্যাৎ এলিয়টের জন্মস্থান দক্ষিণ আমেরিকার পুরনো শহর ও মিসিসিপি নদীর কথা, যে নদীর সৌন্দর্য দেখতে দেখতে কবি হওয়ার বাসনা এলিয়টের। এলিয়টের বেড়ে উঠা ইত্যাদি। অষ্টম অধ্যায়ে রয়েছে এলিয়টের একটি সাক্ষাৎকার। ১৯৫৯ সালে ‘দ্য প্যারিস রিভিউয়ে’ ছাপা হয় এলিয়েটের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। পত্রিকাটি বসন্ত-গ্রীস্ম সংখ্যায় কবিতার শিল্পরূপ নামে ছাপা হওয়া এই সাক্ষাৎকার নেন ডোনাল্ড হল। নিই উয়র্কে এলিয়ট দম্পতির বন্ধু মিসেস লুই হেনরি কোনের বাড়িতে কবির সঙ্গে কথা বলেন ডোনাল্ড হল। স্ত্রী ভালেরিকে নিয়ে তখন যুক্তরাষ্ট্রে বেড়াতে গেছেন এলিয়ট। সাক্ষাৎকারের পুরোটা সময় কবির পাশেই বসে থেকেছেন ভালেরি।

বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে ‘কেমন ছিল ওয়েস্ট ল্যান্ডের কবির মনোজগৎ? নোবেল লরিয়েটের জীবন, বেড়ে উঠা শৈশব? কঠিন শাসনে বেড়ে উঠা টম কীভাবে পরিবারের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গেলেন? শিক্ষকতার পরিবর্তে বেছে নিলেন লেখালেখি। থিতু হলেন পরদেশে। বিয়ে করেন বিদেশিনীকে। ব্যর্থ বিয়ের বিপরীতে শেষ বয়সে শান্তির জীবন। সংসার পাতেন আটত্রিশ বছরের ছোট তরুণীর সঙ্গে। সাতষট্টি বছরের বৃদ্ধ কবি, ঊনত্রিশ বছরের ভালেরি, কী ছিল এই সম্পর্কের সৌন্দর্যের সূত্র? কেন কবি আড়ালে রাখতে চেয়েছেন এমিলি হেলের সঙ্গে সম্পর্ক? জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নানা অভিজ্ঞতা, সংকট, টানাপোড়েন, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব পেরিয়ে কবি টি এস এলিয়টের কবিসত্তাকে খোঁজার চেষ্টা ‘এবং এলিয়ট।’
এবং এলিয়ট লেখক: জাহানারা পারভীন প্রকাশক: কথাপ্রকাশ মূল্য: ৩০০ টাকা বইমেলায় প্রাপ্তিস্থান: সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, প্যাভিলিয়ন ২১।







