ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা খাতকে একটি কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছে। দলটির ঘোষিত শিক্ষা ভাবনা কেবল পাঠ্যক্রম সংস্কার বা অবকাঠামো উন্নয়নে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, নৈতিকতা, ধর্মীয় শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক আচরণ গঠনের সঙ্গে যুক্ত একটি বিস্তৃত রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের রূপ নিয়েছে।
ইশতেহারে ব্যবহৃত ভাষা ও প্রস্তাবগুলো থেকে স্পষ্ট, বিএনপি বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে মুখস্থনির্ভর, বৈষম্যমূলক এবং শ্রমবাজার থেকে বিচ্ছিন্ন বলে মনে করছে, এবং সেই জায়গা থেকেই একটি “জীবনমুখী” শিক্ষা কাঠামো গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষায় জোর: ভিত্তি দুর্বল হলে সবই ভাঙে
বিএনপি বলছে, শিক্ষার সব স্তরেই গুরুত্ব দেওয়া হবে, তবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে প্রাথমিক শিক্ষায়। এর পেছনে যুক্তি সুস্পষ্ট—প্রাথমিক স্তরে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত না হলে পরবর্তী স্তরে শেখার ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রাথমিক শিক্ষকদের আকর্ষণীয় বেতন, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি এবং বিশেষ প্রশিক্ষণের আওতায় আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি মৌলিক মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষাকে প্রাথমিক স্তরের অংশ করার কথাও বলা হয়েছে।
জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ: নতুন প্রতিশ্রুতি
শিক্ষাখাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার অঙ্গীকার বিএনপির ইশতেহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। দলটি বলছে, এই অর্থ কেবল ভবন বা অবকাঠামো নির্মাণে নয়, বরং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে ব্যয় হবে; বিশেষ করে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষাদানের দক্ষতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাসামগ্রী উন্নয়নে।
ডিজিটাল শিক্ষা: ট্যাব, মাল্টিমিডিয়া ও ফ্রি ওয়াই-ফাই
‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের ট্যাবলেট দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, শিক্ষামূলক ভিডিও ও অনলাইন কনটেন্ট ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে। স্কুল, কলেজ, ক্যাফে ও লাইব্রেরিতে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর প্রতিশ্রুতি ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যকে সামনে আনে।
কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা: ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা
বিএনপি মাধ্যমিক স্তর থেকেই তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার কথা বলেছে। জাপানি, কোরীয়, ম্যান্ডারিন, আরবি বা ইতালীয় ভাষার মতো বিষয় যুক্ত করার লক্ষ্য বৈশ্বিক শ্রমবাজার। একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে একজন শিক্ষার্থী এসএসসি বা এইচএসসি পর্যন্ত পড়েই আত্মকর্মসংস্থানে সক্ষম হতে পারে।
আনন্দময় শিক্ষা, খেলাধুলা ও সংস্কৃতি
ইশতেহারে “লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস” ধারণা এনে শিক্ষাকে আনন্দময় করার কথা বলা হয়েছে। দলগত কাজ, ব্যক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন, খেলাধুলা (ফুটবল, ক্রিকেট, সাঁতার) এবং সংগীত, নাটকের মতো সাংস্কৃতিক বিষয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এর লক্ষ্য শিক্ষাকে কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মননশীল নাগরিক তৈরির প্রক্রিয়া হিসেবে গড়ে তোলা।
স্বাস্থ্য, খাদ্য ও সামাজিক সুরক্ষা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট এবং দুর্গম ও প্রান্তিক এলাকায় শিক্ষার্থীদের জন্য মিড-ডে মিল চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কমনরুম ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী সংবলিত ভেন্ডিং মেশিন স্থাপনের কথাও রয়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কার: মূলধারায় সংযুক্তির চেষ্টা
মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার প্রস্তাবে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, আইটি, ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কওমী সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বাধা দূর করার প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন।
আচরণ ও মূল্যবোধ গঠনের ব্যতিক্রমী প্রস্তাব
ইশতেহারে এমন কিছু প্রস্তাব রয়েছে, যেগুলো শিক্ষা ব্যবস্থাকে আচরণগত ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখার ইঙ্গিত দেয়। ‘নতুন কুঁড়ি কুরআন তিলাওয়াত’ প্রবর্তনের মাধ্যমে ধর্মীয় শুদ্ধতা ও শৈল্পিক দক্ষতা তুলে ধরার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
গ্রীষ্মের ছুটিকে ভাগ করে কর্মমুখী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে যুক্ত করার প্রস্তাব শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের দক্ষতার সঙ্গে পরিচিত করানোর চেষ্টা। জাতীয় টেলিভিশনে একটি পৃথক শিক্ষা চ্যানেল চালুর পরিকল্পনা শিক্ষা বিস্তারে গণমাধ্যমের ব্যবহার বাড়াতে পারে।
আর পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীদের পোষ্য প্রাণী পালনে উৎসাহিত করার ধারণাটি দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও যত্নশীল মানসিকতা গঠনের প্রতীকী উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবন
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে আঞ্চলিক কাঠামোয় ভাগ করা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে শক্তিশালী করা, বিশ্ববিদ্যালয়–শিল্পখাত যৌথ গবেষণাগার, ইন্টার্নশিপ, সিড ফান্ডিং ও ইনোভেশন গ্রান্টের প্রস্তাব উচ্চশিক্ষাকে শ্রমবাজার ও উদ্যোক্তা তৈরির সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্যকে সামনে আনে।
শিক্ষা ও রাজনীতি
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও জুলাই–আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ শিক্ষা প্রণোদনার ঘোষণা শিক্ষানীতির সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয়টিকেও যুক্ত করেছে।








