এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর পাকিস্তান সীমান্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তেল পারাপারে সিন্ডিকেট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মোটরসাইকেলে করে পেট্রোলের কন্টেইনার নিয়ে চক্রটি তেল পাচার করছে। ইরান সীমান্ত দিয়ে পাচার হওয়া ট্রাক থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে বাইকাররা। এরপর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেয় তারা।
বুধবার (১৭ জুন) সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
ইরান থেকে পাকিস্তানে তেল পাচারের ভয়াবহ সিন্ডিকেট কয়েক দশক ধরে চলছে। তবে সম্প্রতি ইরান ও ইসরায়েল-মার্কিন উত্তেজনা ও যুদ্ধের প্রভাবে এটি বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে। এতে করে ইরান থেকে পাচার হওয়া পেট্রোল ও ডিজেলের চাহিদা পাকিস্তানে বেড়েছে।

বেলুচিস্তানের হাজার হাজার চোরাকারবারির মতো মাজার নামের এক ব্যক্তিও (নিরাপত্তার স্বার্থে যার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে) অন্যান্য খোলা আকাশের নিচে বসা বাজার এবং অনুমোদনবিহীন পেট্রোল স্টেশনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ করেন। প্রচণ্ড তাপ প্রবাহের মধ্যে পৃথিবীর অন্যতম উত্তপ্ত অঞ্চলের মধ্য দিয়ে ৩৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সিন্ধু প্রদেশে জ্বালানি পৌঁছে দেন তিনি।
তেল পরিবহনের সময় কখনও কখনও বেলুচিস্তানের তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এতে ক্যানগুলো ফুলে নরম হয়ে যায়। ফলে যেকোনো সময় এটি ফেটে বা মুখ খুলে গেলে ভয়াবহ আগুন এবং বিস্ফোরণের ঝুঁকি রয়েছে। অনেক পাচারকারী এভাবে প্রাণ হারিয়েছেন।
এর বাইরে আরও নানা ধরনের বিপদ রয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম হলো বেলুচিস্তানে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে প্রায় সংঘর্ষ হয়। এমন বিপৎসংকুল পথ তাদের পাড়ি দিতে হয়।
মাজার বলেন, আমাদের কাছে অন্য কোনো বিকল্প নেই বলেই আমরা এটা করছি। প্রচণ্ড গরম আর তেলের দামও অত্যাধিক। এছাড়া তেল পরিবহনের জন্য আমাদের দিন-রাত সড়কেই পার হয়ে যায়।

চোরাচালান কার্যক্রমের সঠিক মাত্রা জানা যায়নি, তবে ২০২৪ সালে জাপানি সংবাদ ওয়েবসাইট নিক্কেই এশিয়া জানায়, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ফাঁস হওয়া একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতি বছর ইরান থেকে পাকিস্তানে ১ বিলিয়ন ডলার (৭৪৫ মিলিয়ন পাউন্ড) মূল্যের জ্বালানি পাচার করা হতো।
পাকিস্তানের আইন অনুযায়ী জ্বালানি পাচার অবৈধ। দেশটিতে এর শাস্তি হিসেবে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
বেলুচিস্তানের কোয়েটা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি ফিদা হোসেন দস্তি বলেন, কর্মসংস্থানের অভাবে এই অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ নিরুপায়। এমনকি এমএ পাস করা ছাত্ররাও শেষ পর্যন্ত এই তেলের ব্যবসায় নামতে বাধ্য হয়।
দুই দেশের মধ্যে গড়ে ওঠা পাচারচক্রের পেছনে অত্যন্ত জটিল রাজনীতি রয়েছে। পাকিস্তান একদিকে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুর্গম সীমান্ত হওয়ায় এটি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এছাড়া বেলুচিস্তানের মানুষের জন্য বেঁচে থাকার একমাত্রা উপায় হয়ে উঠেছে এই চোরাকারবারি।
সীমান্তে তেল পাচারের জন্য ইরান অপরাধী চক্রকে দায়ী করছে। তবে ‘গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অ্যাগেইনস্ট ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইমের’ প্যাডি গিন বলেন, প্রধান পাচারকারীরা ইরানি বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে তারা এমনটি করে থাকতে পারে।
এ বিষয়ে ইরানের সরকারের কাছে বক্তব্য চাওয়া হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।







