পশ্চিমবঙ্গের আরজি কর কাণ্ডে বুধবার (৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় ‘রাত দখল’ কর্মসূচি। অন্য সবার মতো তাতে যোগ দিতে গিয়েছিলেন ভারতীয় বাংলা সিনেমার অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। শ্যামবাজারে যাওয়ার পরই তুমুল বিক্ষোভের মুখে পড়েন তিনি। তাকে উদ্দেশ্য করে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দিতে থাকেন আন্দোলনকারীরা, এমনকি তার গাড়িতেও হামলা চালানো হয়।
বুধবার সন্ধ্যা থেকে কলকাতার শ্যামবাজারের পাঁচমাথা মোড়ে আন্দোলনে শামিল হন অগণিত মানুষ। তাতে অংশ নেন টলিউডের তারকারাও। প্রায় মধ্যরাতে সেখানে পৌঁছান অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। এরপর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সুবিচারের দাবিতে কথা বলেন ঋতুপর্ণা।
কিছুক্ষণের মধ্যে এ অভিনেত্রীকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। অভিনেত্রীকে উদ্দেশ্য করে ‘গো ব্যাক’, ‘ধিক্কার’ স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত গাড়িতে ওঠেন ঋতুপর্ণা। তাতেও পরিস্থিতি সামলানো কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে। গাড়ি ঘিরেও চলে বিক্ষোভ। অভিনেত্রীর গাড়ি লক্ষ্য করে বোতল ছোড়া হয়। এরপর ঋতুপর্ণা কোনোক্রমে এলাকা ছাড়েন বলে জানা গেছে।
কঠিন এই পরিস্থিতি মুখোমুখি হয়ে রীতিমত ভেঙে পড়েছেন ঋতুপর্ণা। কলম তুলে নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারে লিখেছেন, কেন এমন কিছুর সাক্ষী হতে হলো তাকে?
অভিনেত্রী লেখেন, আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিহত চিকিৎসক-পড়ুয়ার জন্য সুবিচার চেয়ে ৪ সেপ্টেম্বর শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ের প্রতিবাদী জমায়েতে উপস্থিত হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এত মানুষের প্রতিবাদ বৃথা যাবে না। আমিও সুবিচারের আশায় রয়েছি। জমায়েতে যোগ দিয়ে মোমবাতি জ্বালাই। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বদলে গেল ছবিটা। আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভের মুখে পড়লাম। আমার উদ্দেশে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দিতে শুরু করেন অনেকে। চারপাশ থেকে উলুধ্বনি এবং শঙ্খ বাজিয়ে ব্যঙ্গ। এতে কিছু মনে করেছি, এমন নয়। কিন্তু, তারপর গাড়িতে জুতা ছোড়া হল। তখন আমি দরজা খুলে বলি আপনারা এমন করবেন না। আপনাদের সঙ্গে কথা বলতেই এসেছি, বসতে এসেছি। কিন্তু কেউ কোন কথাই শুনলেন না। আসলে আমার মনে হয়, কিছু মানুষ প্রতিবাদের কথা মাথায় না রেখে, হুজুগে চলে গিয়েছিলেন জমায়েতে।
ঋতুপর্ণা লেখেন, বুঝতে পারছি, সকলেই ক্ষুব্ধ। কিন্তু কলকাতার প্রতিবাদী চেহারার মধ্যে এই চেহারাটা দেখে আমি লজ্জিত, আহত, কম্পিত। বুধবার রাতে আমার প্রাণটাও চলে যেতে পারত। আমি একজন অরাজনৈতিক, নিরপেক্ষ মানুষ হিসেবে, একজন মহিলা হিসেবে অন্য মহিলার পাশে দাঁড়াতে এসেছিলাম। কিন্তু বিরাট সংখ্যক কিছু মদ্যপ এই ঘটনা ঘটাল। আচমকাই একটা জনস্রোত ধাক্কা দিতে শুরু করল। এত চিৎকার হচ্ছিল যে, কারও কোনও কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না।
অভিনেত্রীর কথায়, আমি তো কাল কোনও তারকা হিসেবে নয়, সাধারণ মানুষ হিসাবে গিয়েছিলাম। যেখানে ঘটনাটা ঘটল সেখানে নিহত চিকিৎসকের বাবা-মাও এসেছিলেন। ভেবেছিলাম একবার দেখা করব তাদের সঙ্গে। বলতাম, এই লড়াইয়ের সঙ্গে আমিও আছি। কিন্তু সেটা আর হলো কই? তবে এই ঘটনার পর আমি থেমে যাব, এমন নয়। আমার মনের মধ্যে প্রতিবাদ থাকবে। আমিও একইভাবে সুবিচার চাইব। সেটা থামবে না।
সবশেষ ঋতুপর্ণা লেখেন, আমি প্রশ্ন করতে চাই আমার সমবেদনা জানানো কি অন্যায়? একটি মেয়ের হয়ে তারা আন্দোলন করছেন আর অন্য একজন নারীকেই হেনস্তার শিকার হতে হলো! হয়তো এই মানসিকতাই আমাদের বর্বরতার দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে।- আনন্দবাজার








