ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর। এফবিসিসিআইসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনকে আরও পেশাদার ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো পাপেটের (পুতুল) মতো আচরণ করছে।’ ৬ থেকে ৯ শতাংশ সুদহার নির্ধারণের সময় তারা তালি দিয়েছিল এবং অর্থ পাচারের সময়ও নীরব থেকেছে-এমন আচরণ গণতন্ত্রকে কখনোই শক্তিশালী করে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকার একটি হোটেলে ‘ব্যাংকিং খাতের ওপর এলডিসি উত্তরণের প্রভাব: বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন গভর্নর। একই অনুষ্ঠানে তিনি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণকে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমার বিষয় নয়, বরং অর্থনৈতিক দক্ষতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অর্জনের একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার আহ্বান জানান।
গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণকে কেবল একটি সময়সীমা বা ডেডলাইন হিসেবে না দেখে এটিকে অর্থনৈতিক দক্ষতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অর্জনের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তার মতে, উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালাগুলো মূলত একটি শক্তিশালী জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ, যেখানে লজিস্টিকস, অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে অতিরিক্ত গুরুত্ব না দিয়ে অর্থনীতিকে প্রস্তুত করাই বেশি জরুরি। বাংলাদেশকে আর দক্ষিণ সুদান বা আফগানিস্তানের মতো সংগ্রামী দেশের সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বরং থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের পর্যায়ে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।
ড. মনসুর বলেন, ‘আমি মনে করি না বাংলাদেশ এখন আর এলডিসি সম্প্রদায়ের অংশ।’ শুধু বাণিজ্য সুবিধার জন্য এলডিসি তকমা আঁকড়ে ধরলে দেশের বৈশ্বিক মর্যাদা ও সম্মান ক্ষুণ্ন হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য উন্নত লজিস্টিকস, বন্দর ব্যবস্থাপনা, সড়ক যোগাযোগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন গভর্নর। তিনি বলেন, উন্নয়ন কৌশলে এমন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যা ব্যয় কাঠামোকে প্রতিযোগিতামূলক করবে এবং শ্রম ও শিল্পখাতে উৎপাদনশীলতা বাড়াবে।
আর্থিক খাতের প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই টেকসই উন্নয়নের প্রধান শর্ত। বিনিময় হার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল না থাকলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে তিনি সতর্ক করেন। তিনি জানান, সামষ্টিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আগামী জুনের মধ্যে কমপক্ষে ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রিজার্ভ অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং পরবর্তী জুনে তা ৪০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, গত কয়েক মাস ধরে টাকার বিনিময় হার ১২২.৩ টাকা প্রতি ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি বাজার থেকে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার কিনেছে, যার ফলে একদিকে রিজার্ভ বেড়েছে, অন্যদিকে অর্থনীতিতে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা তারল্য সরবরাহ হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে ড. মনসুর বলেন, জবাবদিহিতার অভাবে বাজারে মূল্যস্ফীতির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা ভাঙতে না পারলে বাজারদর স্থিতিশীল করা কঠিন হবে। এ ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন ব্যাংকিং কমিশনের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ এ. (রুমী) আলী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিব।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার, আইসিসি বাংলাদেশ সহসভাপতি এ কে আজাদ, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন এবং আইসিসি বাংলাদেশ সহসভাপতি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসের এজাজ বিজয়।
ব্যাংকিং খাতের দৃষ্টিকোণ থেকে মাহবুবুর রহমান বলেন, এলডিসি উত্তরণের ফলে উন্নয়ন অর্থায়নের ধারা পরিবর্তিত হবে, বাণিজ্য ও রপ্তানি অর্থায়নের ঝুঁকি বাড়বে এবং নিয়ন্ত্রক ও কমপ্লায়েন্স প্রত্যাশা আরও কঠোর হবে। তিনি বলেন, রেয়াতমূলক বৈদেশিক অর্থায়ন কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের ব্যয় বাড়বে, ফলে দেশীয় ব্যাংকগুলোকে অবকাঠামো উন্নয়ন ও উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নে আরও সক্রিয় হতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, প্রাইম ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান ও. রশীদ, প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল হক, পিকার্ড বাংলাদেশ-এর উপব্যবস্থাপনা পরিচালক অমৃতা মাকিন ইসলাম এবং ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিমীন রহমান।








