যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের হাউস অব লর্ডসে ‘বাংলাদেশে ক্যান্সার সেবার ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে বাংলাদেশের ক্যান্সার রোগীদের সংকট ও সম্ভাবনার বিষয়টি আলোচিত হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ক্যান্সার এইড ট্রাস্ট (ব্যানক্যাট) আয়োজিত একাধিক সভা, মতবিনিময়, ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্যান্সার বাস্তবতা নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তিনটি বিষয়—ক্যান্সার চিকিৎসায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জ্ঞান বিনিময়, দক্ষতা উন্নয়ন ও মেডিকেল নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা এবং বাংলাদেশি রোগীদের কণ্ঠকে বৈশ্বিক অঙ্গনে তুলে ধরা।
ব্যানক্যাট-এর নির্বাহী পরিচালক নাজমুস আহমেদ আলবাব বলেন, “আমরা সহানুভূতি চাই না; চাই অংশীদারিত্ব, যাতে প্রতিটি ক্যান্সার রোগী পায় সময়োপযোগী, সাশ্রয়ী ও মানবিক চিকিৎসা।”
বাংলাদেশে ক্যান্সার এখন শুধু একটি রোগ নয়—এটি হয়ে উঠেছে একটি সামাজিক ও মানবিক সংকট। প্রতিবছর এক লাখ পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন। কিন্তু সীমিত স্বাস্থ্য অবকাঠামো, চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়, এবং সময়মতো রোগ শনাক্ত না হওয়ার কারণে অসংখ্য মানুষ চিকিৎসার সুযোগ পান না। যারা বেঁচে থাকেন, তাদের অধিকাংশই হারান আর্থিক স্থিতি, আত্মবিশ্বাস, ও মর্যাদাবোধ।

এ প্রেক্ষাপটে, কিছু মানুষ আশার আলো জ্বালিয়েছেন। তাদের প্রচেষ্টার নাম বাংলাদেশ ক্যান্সার এইড ট্রাস্ট (ব্যানক্যাট)—একটি কমিউনিটি-নির্ভর মানবিক উদ্যোগ, যা রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি তার পরিবার ও সমাজকে যুক্ত করছে সচেতনতা, সহানুভূতি ও সহযাত্রার বন্ধনে।
লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলে আরেক মতবিনিময় সভায় উপস্থাপন করা হয় দেশের প্রথম “ক্যান্সার কেয়ার ভিলেজ” গড়ার পরিকল্পনা। এটি কেবল একটি হাসপাতাল নয়—বরং এক পূর্ণাঙ্গ নিরাময় কমিউনিটি। যেখানে থাকবে রোগী ও পরিবারের আবাসন, পুষ্টি, কাউন্সেলিং, সেবাদাতা প্রশিক্ষণ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, গবেষণা কেন্দ্র এবং প্যালিয়েটিভ কেয়ার।
এই উদ্যোগের মূল দর্শন—“চিকিৎসা শুধু ওষুধ নয়, মর্যাদারও পুনরুদ্ধার। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ব্যারোনেস মানজিলা উদ্দিন, ব্যানক্যাট সভাপতি এ. ফারজাদ আহমেদ, ইউকেবিসিসিআই পরিচালক ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা রোহেমা মিয়া, এবং ফ্রেন্ডস অব ব্যানক্যাট ইউকের কনভেনর মোকসুদ আহমেদ খান।
এই উদ্যোগকে ঘিরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা গড়ে তুলেছেন ফ্রেন্ডস অব ব্যানক্যাট ইউকে—একটি স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক যা সচেতনতা বৃদ্ধি, অনুদান সংগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে কাজ করছে।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের হ্যাম্পশায়ারের ফ্লিট শহরে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে প্রবাসী বাংলাদেশিরা একত্রিত হন রোগীদের পাশে দাঁড়াতে। অনুষ্ঠানের টেবিল সাজানো ছিল ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী ও তাঁদের সেবাদানকারীদের তৈরি হস্তশিল্প দিয়ে—‘আলোক কাথা’ নামে একটি প্রকল্পের ফল। এই হস্তশিল্প বিক্রির আয় ব্যয় হয় বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগীদের সহায়তায়। এটি প্রমাণ করে—আবেগ নয়, কাজই হতে পারে সংহতির ভাষা।
ব্যানক্যাটের এই যুক্তরাজ্য যাত্রা কেবল অর্থ সংগ্রহের প্রচেষ্টা নয়—এটি এক মানবিক আন্দোলন। যেখানে দুই দেশ, দুই সংস্কৃতি, এবং দুই সমাজ যুক্ত হয়েছে এক প্রতিশ্রুতিতে—ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সম্মিলিত লড়াই।
বাংলাদেশে এখন সময় এসেছে ক্যান্সার চিকিৎসাকে হাসপাতালের দেয়াল ছাড়িয়ে সমাজের আন্দোলনে পরিণত করার। এটি শুধু চিকিৎসা নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সচেতনতা এবং সম্মিলিত মানবতার প্রকাশ।








