জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিক পরিসরে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্পর্শ করল বাংলাদেশ। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় (এমওইএফসিসি) স্থানীয়ভাবে পরিচালিত অভিযোজনের জন্য জাতীয় কাঠামো ও কর্মপরিকল্পনা (লোকালি লেড এডাপটেশন-এলএলএ) আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছে। বিশ্বব্যাপী এই ধরনের প্রথম কাঠামোগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
জলবায়ু-সহনশীল জাতি গঠনে বাংলাদেশের দৃঢ় প্রতিশ্রুতির প্রতীক হিসেবে ২০২৫ সালের মে মাসে মন্ত্রিসভা এই কাঠামোর অনুমোদন দেয়। গত সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) এ উপলক্ষে ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তথ্যটি জানান।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ব্রিটিশ হাইকমিশনের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও), জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও, জলবায়ু কর্মী, শিক্ষাবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ প্রায় ১৫০ জন অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এমওইএফসিসি-এর অতিরিক্ত সচিব (জলবায়ু পরিবর্তন শাখা) মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ।

জলবায়ু প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবসম্মত ও স্থানীয়ভাবে পরিচালিত অভিযোজন ব্যবস্থায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে এই প্রচারণাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমওইএফসিসি-এর অতিরিক্ত সচিব (জলবায়ু পরিবর্তন শাখা)-এর সভাপতিত্বে গঠিত এলএলএ ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়ন কমিটি এই কাঠামো উন্নয়ন প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দেন। এডিবি, বিশ্বব্যাংক ও ইউএনডিপি পুরো প্রক্রিয়ায় কারিগরি ও পরামর্শমূলক সহায়তা প্রদান করে। এডিবি তার কমিউনিটি রেজিলিয়েন্স পার্টনারশিপ প্রোগ্রাম (সিআরপিপি)-এর আওতায় কারিগরি সহায়তা দেয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, স্থানীয়ভাবে পরিচালিত এই অভিযোজন কাঠামো নীতিকে বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি নিশ্চিত করবে যে, পরিকল্পনাগুলো কেবল নথিতে সীমাবদ্ধ না থেকে মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বাস্তব অভিযোজন কার্যক্রমে রূপ নেবে।
মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ কৌশলগত জলবায়ু অর্থায়নের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন সীমিত ও অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় এই কাঠামো প্রতিটি সম্পদের বিচক্ষণ ও সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করবে, যাতে সারা দেশে অভিযোজন কার্যক্রমে সর্বোচ্চ প্রভাব সৃষ্টি হয়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ক্লাইমেট ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ (বিসিডিপি) এই কাঠামোর দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তব ও তাৎপর্যপূর্ণ কর্মে রূপ দেওয়ার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হতে পারে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল মাকসুদ জাহেদী বলেন, এই কাঠামো একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এটি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আজকের এই প্রচারণাই এটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সূচনা।
এডিবি-এর বাংলাদেশ রেসিডেন্ট মিশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর হো ইউন জিওং বলেন, স্থানীয় সরকার ও সম্প্রদায়ের কাছে বৈশ্বিক ও দেশীয় জলবায়ু অর্থায়ন দক্ষতার সঙ্গে পৌঁছে দিতে জাতীয় ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এডিবি সহায়তা করবে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার, ক্ষুদ্র কৃষক, নারী, উদ্যোক্তা ও শহুরে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বাস্তব স্থিতিস্থাপক ফলাফল অর্জনে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ইউএনডিপি-এর আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার বলেন, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও জাতীয় ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই কাঠামো প্রণয়নে এমওইএফসিসি, এডিবি ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারিত্বে কাজ করতে পেরে ইউএনডিপি গর্বিত। তিনি জানান, দেশব্যাপী লজিক (এলওজিআইসি) প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে স্থানীয়ভাবে পরিচালিত অভিযোজন কার্যক্রম সম্প্রসারণে এই কাঠামো দিকনির্দেশনা দেবে।
এফসিডিও-এর জলবায়ু ও পরিবেশ বিভাগের টিম লিডার নাথানিয়েল স্মিথ বলেন, এই কাঠামোর বাস্তবায়ন বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাপী উচ্চমানের, স্থানীয়ভাবে পরিচালিত জলবায়ু অভিযোজনের একটি অগ্রগামী উদাহরণ হিসেবে আরও সুদৃঢ় করবে। তিনি কাঠামোটিকে সফল করতে সকল অংশীজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সিনিয়র পরিবেশ বিশেষজ্ঞ কীর্তন চন্দ্র সাহু বলেন, স্থানীয়ভাবে পরিচালিত স্থিতিস্থাপকতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই একটি আঞ্চলিক নেতা। এই কাঠামো স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু কর্মকাণ্ডকে বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিকে আরও সুসংহত করবে।
তিনি জানান, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ, স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অর্থায়ন ব্যবস্থার সমন্বয়ে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।
মূল বক্তা এডিবির জলবায়ু পরিবর্তন পরিচালক অর্ঘ্য সিনহা রায় বলেন, বিশ্বব্যাপী প্রমাণ রয়েছে যে, ঝুঁকি হ্রাসে স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং স্থানীয় সম্প্রদায় ও সরকারকে সম্পদ সরবরাহ করা হলে সর্বোত্তম ফল পাওয়া যায়। এই কাঠামোর মূল লক্ষ্যই হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সম্পদের ক্ষমতা স্থানীয় পর্যায়ে হস্তান্তর করা।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় স্থানীয়ভাবে পরিচালিত অভিযোজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয় সম্প্রদায়ের সম্ভাবনা ও সৃজনশীলতাকে উন্মুক্ত করতে সহায়তা করবে।
উল্লেখ্য, এলএলএ জাতীয় কাঠামো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সম্প্রদায়-নির্ভর জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রম পরিচালনার পথ সুগম করবে, যা জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।








