২০২২ সালের জুলাইয়ে আইএমএফের কাছে ঋণের আবেদন করে বাংলাদেশ। ছয় মাস পর সংস্থাটি এ বছরের ৩০ জানুয়ারি ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ দেবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। বলা হয়, ২০২৬ সাল পর্যন্ত সাড়ে তিন বছরে মোট সাত কিস্তিতে পাওয়া যাবে এ অর্থ। গত ২ ফেব্রুয়ারি প্রথম কিস্তির অর্থ ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তির ঋণের অর্থ ছাড় পেতে অনেকগুলো শর্ত পূরণ করতে হবে বাংলাদেশকে। সেই শর্ত পালনে সঠিক পথে আছে বাংলাদেশ।
দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড় করেছে আইএমএফ
• বাংলাদেশকে দেওয়া ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি হিসেবে ৬৮ কোটি ৯৮ লাখ মার্কিন ডলার ছাড় করেছে আইএমএফ।
• ওয়াশিংটনে আইএমএফের প্রধান কার্যালয়ে গত মঙ্গলবার সংস্থাটির নির্বাহী পর্ষদের বৈঠকে বাংলাদেশকে দ্বিতীয় কিস্তির ঋণের অর্থ দেওয়ার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়।
• বৃহস্পতিবার (১৪ ডিসেম্বর) এই অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে আসতে পারে।
আইএমএফ এর ঋণের তৃতীয় কিস্তি
• তৃতীয় কিস্তির অর্থ ছাড় করার কথা রয়েছে আগামী জুন মাসে।
• এর আগে আইএমএফ ঋণ কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যালোচনা করবে।
• তৃতীয় কিস্তির জন্য যেসব সংস্কার করতে হবে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে:
* করছাড় কমানো
* জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়
* ভর্তুকি যৌক্তিক করার কৌশল নির্ধারণ এবং
* খেলাপি ঋণ কমানো।
আইএমএফ এর ঋণের চতুর্থ কিস্তি
• চতুর্থ কিস্তির অর্থছাড়ের পর্যালোচনা আগামী ডিসেম্বর মাসে।
• তখন যেসকল বিষয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে:
* তখন রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের তালিকা নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা
* ব্যাংক খাতের তদারকিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন
* নীতি সুদহারের কাঠামো ঠিক করা
* রাষ্ট্রমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ঝুঁকি কমানো
জুনের আগে যেসব শর্ত
• আইএমএফ সূত্রে জানা গেছে, আগামী জুন মাসের মধ্যে রাজস্ব, আর্থিক, জ্বালানি, সামাজিক নিরাপত্তা—এই চারটি খাতেই দৃশ্যমান বড় সংস্কার করতে হবে।
• রাজস্ব খাতে সংস্কারের অন্যতম হলো আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট এবং শুল্ক খাতে বছরের পর বছর যেসব কর ছাড় দেওয়া হয়েছে, তা কমাতে হবে।
• ইতোমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য সামস উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে এ লক্ষ্যে একটি দল কাজ করছে। আগামী বাজেটে এর প্রতিফলন থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
• চলতি অর্থবছর থেকেই মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক-কর আদায়ের যে শর্ত আছে, তাতে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা দেখাতে হবে তৃতীয় কিস্তির অর্থছাড়ের আগেই।
• চলতি অর্থবছরে বাজেটে এনবিআরের লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়। তবে আইএমএফ এই লক্ষ্য কমিয়ে বলেছে, ৪ লাখ কোটি টাকা আদায় করলেই হবে। অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) অবশ্য মাত্র ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার শুল্ক-কর পেয়েছে এনবিআর।
• আগামী বাজেটের আগে ভ্যাট ও কাস্টমস শাখায় একটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিট স্থাপন করতে হবে। তবে এনবিআর দুটি এমন ইউনিট স্থাপন করেছে। এসব ইউনিট অবশ্য এখনো পুরোদমে কাজ শুরু করেনি।
• জুনের আগে সরকারের দেওয়া ভর্তুকির ক্ষেত্রে দুটি বড় শর্ত আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দর ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করার একটি ‘দাম নির্ধারণ কৌশল’ তৈরির কাজ করতে হবে সরকারকে।
• সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নেওয়া কর্মসূচিগুলো যৌক্তিক করার শর্ত আছে। এই শর্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্য হলো, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি যেন সুরক্ষা বাড়ানো যায়।
• জুন মাসের আগে আইএমএফের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক ও বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমানো; মূলধনের জোগান বাড়ানো; প্রভিশনিং রাখা—এসব শর্ত পালন করতে হবে।
• বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, খেলাপি ঋণ মোট ঋণের ১০ শতাংশের নিচে রাখার কথা বলেছে আইএমএফ।
• সর্বশেষ হিসাবে, গত সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত মোট বিতরণকৃত ঋণের ৯ শতাংশের মতো খেলাপি হয়ে আছে। তবে সমস্যার বিষয় হলো, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে এই হার এখনো ২৫ শতাংশ।
• এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আনতে আন্তর্জাতিক আর্থিক রিপোর্টিং মান বা আইএফআরএস অনুযায়ী একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করার শর্তও আছে।
• এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব ব্যাংক ও আর্থিক খাতের জন্য একটি নির্দেশিকা তৈরি করতে হবে।
• বিদেশি ঋণ পরিশোধসহ যাবতীয় ব্যবস্থাপনার একটি পরিকল্পনা বানানোর কথাও বলেছে আইএমএফ।
ডিসেম্বরের আগে যেসব শর্ত
• জুন মাসের আগে নেওয়া ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের শর্তগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি কতটা হয়েছে—এটিও ডিসেম্বর মাসে পর্যালোচনা করে দেখা হবে।
• পাশাপাশি ব্যাংক খাতে বেশ কিছু বড় শর্ত পূরণ করতে হবে। যেমন ডিসেম্বর মাসের আগে সংশোধিত দেউলিয়া আইন এবং সংশোধিত অর্থঋণ আদালতের আইন জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের বাধ্যবাধকতা আছে।
• ব্যাসেল-৩-এর মানদণ্ড অনুযায়ী রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের তালিকাসহ প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধরনের সম্পদের তালিকা তৈরি করা শুরু করেছে।
• অন্যদিকে ব্যাংক খাতের তদারকি বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বাস্তবায়ন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করবে এমন শর্ত আছে।
• এ ছাড়া আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘোষণায় রাষ্ট্রমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ঝুঁকি বিবৃতি প্রকাশ করতে হবে।
• নীতি সুদহার নির্ধারণের বিষয়টি একটি কাঠামোর মধ্যে আনার শর্তও দিয়েছে আইএমএফ।
শর্ত পালনে সঠিক পথে বাংলাদেশ
• বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুমুখী বাহ্যিক আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তা সত্ত্বেও আইএমএফের পরিচালকেরা মনে করেন, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও সংস্থাটির শর্ত পরিপালনে বাংলাদেশ সামগ্রিকভাবে সঠিক পথে রয়েছে।
• এছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশ যেসব সংশোধনমূলক ব্যবস্থা হাতে নিয়েছে এবং জরুরি সংস্কার বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে, তাকে স্বাগত জানিয়েছে বহুপক্ষীয় এ সংস্থা।
• মুদ্রানীতির কাঠামো আরও আধুনিকায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া উদ্যোগের প্রশংসা করেছে আইএমএফ। সংস্থাটি বলেছে, মুদ্রানীতি আধুনিক হলে তার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমার পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির প্রভাব জোরদার হবে।
• মুদ্রার একক বিনিময় হার গ্রহণের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছে আইএমএফ। এ ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে আরও নমনীয় হওয়ার ওপর জোর দিয়েছে। অর্থনীতির বহিস্থ ধাক্কা মোকাবিলায় এটি জরুরি বলে মনে করে সংস্থাটি।
আইএমএফ এর পরামর্শ
• সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধি সহায়ক বিনিয়োগ জরুরি। তাই করনীতি সংশোধন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কর আদায় বৃদ্ধিতে জোর দিয়েছে সংস্থাটি।
• ভর্তুকির যৌক্তিকীকরণ, ব্যয় করার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দক্ষতার সঙ্গে আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্ব দিয়েছে তারা।
• ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি কমাতে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি পুঁজি পুনরুদ্ধারে বিশেষ কৌশল প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।
• জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রোধে সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা দরকার।
• পরিবেশবান্ধব সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করার তাগিদ দিয়েছে তারা। আইএমএফ মনে করে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা উন্নত হলে তা আর্থিক খাতের আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।
• প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধি, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ ও সামগ্রিকভাবে প্রবৃদ্ধির গতি বাড়াতে শ্রমশক্তিতে বাণিজ্য উদারীকরণ, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, শ্রমশক্তির দক্ষতা উন্নয়ন ও নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা জরুরি বলে সংস্থাটির মত।
• আইএমএফ এর পরিচালকেরা মনে করেন, স্বল্পমেয়াদি নীতি প্রণয়নের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ মূল্যস্ফীতির রাশ টানা এবং বহিস্থ ধাক্কা মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি।







