উৎসবের রঙ আর নিরাপত্তার সমন্বয়ে রাজধানীতে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবারের বৈশাখী শোভাযাত্রা। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিতে এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নেমেছিল নানা বয়সি মানুষের ঢল। নতুনের আহ্বানে চারপাশ ছিল রঙিন সাজে সজ্জিত।
আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৫ মিনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হওয়া শোভাযাত্রা প্রায় এক ঘণ্টা ধরে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে সকাল ১০টা ৫ মিনিটে একই স্থানে এসে শেষ হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’, যা শোভাযাত্রার প্রতিটি অংশে প্রতিফলিত হয়েছে।
শোভাযাত্রার নির্ধারিত পথ ছিল চারুকলা অনুষদের উত্তর গেট থেকে শাহবাগ থানা এলাকা ঘুরে রাজু ভাস্কর্য, দোয়েল চত্বর হয়ে বাংলা একাডেমি অতিক্রম করে আবার চারুকলায় ফেরা।
চারুকলা থেকে শুরু হওয়া এই শোভাযাত্রার মূল আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে পাঁচটি বিশেষ মোটিফ। এগুলো হলো মোরগ, বেহালা, পায়রা, হাতি ও ঘোড়া। আয়োজকরা জানিয়েছেন, এই প্রতীকগুলো শক্তি, সৃজনশীলতা, শান্তি, গৌরব ও গতিশীলতার বার্তা বহন করছে। বাঁশ, কাঠ আর রঙিন কাগজের নিপুণ কারুকার্যে তৈরি বিশাল এই প্রতিকৃতিগুলো অশুভ শক্তির বিনাশ এবং কল্যাণময় ভবিষ্যতের জয়গান গাইছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনার এই সর্বজনীন উৎসবে জাতি, ধর্ম ও বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে উৎসবে মেতেছে সাধারণ মানুষ।
শোভাযাত্রায় প্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থী জাতীয় পতাকা বহন করছেন। এছাড়া ৩৫ জন যন্ত্রশিল্পীর বাঁশি ও দোতারার সুরে বেজে উঠছে ‘এসো হে বৈশাখ’। উৎসবের এই দিনটি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য মোহনায় পরিণত হয়েছে। পুরোনো বছরের ক্লান্তি ও শোককে বিদায় জানিয়ে ঋতুচক্রের এই নতুনায়ন সবার মনেই নতুন আশার আলো বয়ে এনেছে।
এরআগে ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই রাজধানীর রমনা বটমূলে সুরের মূর্ছনায় শুরু হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ১৯৬৭ সাল থেকে এই আয়োজন করে আসছে।
এবারও ‘জাগো আলোক-লগনে’ গানের মাধ্যমে শুরু হওয়া দুই ঘণ্টার এই প্রভাতী আয়োজনে গাওয়া হয় মোট ২২টি গান। জীর্ণতা মুছে নতুনের আহ্বানে সব শ্রেণিপেশার মানুষ সেখানে সমবেত হয়। মানুষের কাছে এটি কেবল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং শেকড়ে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য উপলক্ষ।
এই পুরো সময়জুড়ে শোভাযাত্রাকে ঘিরে তৈরি করা হয় কঠোর নিরাপত্তা বলয়। বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শোভাযাত্রার সামনে ও পেছনে অবস্থান নিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও নজরদারিতে ছিলেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম জানান, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আগাম পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামা হয়েছিল। তার মতে, উৎসবটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়াই ছিল সবচেয়ে বড় সাফল্য।
বৈশাখী এই আনন্দ আয়োজন ঘিরে রাজধানীজুড়ে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। রমনা বটমূল ও চারুকলা এলাকা ছাড়াও টিএসসি এবং রবীন্দ্র সরোবরেও মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। উৎসবের সার্বিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে।

