ইরানে সামরিক আগ্রাসন চালালে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন।
সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট ও অ্যাক্সিওস-এর বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত শীর্ষ জেনারেলের এই সতর্কবার্তাকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তারা তাঁর যুদ্ধের পরিকল্পনার সঙ্গেই আছেন।
ওয়াশিংটন পোস্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে ফ্লোরিডার পাম বিচে মার-এ-লাগো রিসোর্টে অনুষ্ঠিত এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে জেনারেল কেইন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে স্পষ্ট ভাষায় ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন।
জেনারেল কেইন জানান, এই মুহূর্তে বড় কোনো যুদ্ধে জড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে ভুল হবে। এর পেছনে তিনি প্রধানত দুটি কারণ উল্লেখ করেন:
১. অস্ত্রের মজুত হ্রাস: ইউক্রেন ও ইসরায়েলকে দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক সহায়তা দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডারে টান পড়েছে। ইরানের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো পর্যাপ্ত ‘প্রিসিশন গাইডেড মিউনেশন’ (নির্ভুল লক্ষ্যভেদী বোমা) বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে।
২. আঞ্চলিক মিত্রদের অনীহা: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথাগত মিত্র দেশগুলো ইরানের পাল্টা হামলার ভয়ে নিজেদের মাটি বা আকাশসীমা ব্যবহার করতে দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। মিত্রদের পূর্ণ সহায়তা ছাড়া ইরানে হামলা চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
সংবাদমাধ্যমে এসব তথ্য ফাঁস হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘গণমাধ্যমে যা লেখা হচ্ছে, তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা। জেনারেল কেইন ইরানে হামলার বিরোধিতা করেননি। তিনি কখনোই বলেননি যে এই হামলা সীমিত পরিসরে হতে হবে। তিনি একজন বিজয়ী যোদ্ধা। নির্দেশ পেলে তিনি সামনে থেকেই নেতৃত্ব দেবেন।’
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধ নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে, হোয়াইট হাউসের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ইরান ইস্যুতে বড় ধরনের মতভেদ রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত জানুয়ারি মাসে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপসারণের অভিযানে জেনারেল কেইন পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে তিনি ‘অনিচ্ছুক যোদ্ধা’র ভূমিকা পালন করছেন। তাঁর মতে, ভেনিজুয়েলা আর ইরান এক নয়; ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও পাল্টা আঘাত করার ক্ষমতা অনেক বেশি, যা অসংখ্য মার্কিন সেনার প্রাণহানির কারণ হতে পারে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযানের মূল তদারককারী সংস্থা ‘সেন্টকম’ (ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড)-এর প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারকে গত জানুয়ারি থেকে হোয়াইট হাউসের কোনো ইরান-বিষয়ক বৈঠকে ডাকা হয়নি। রণক্ষেত্রে যিনি নেতৃত্ব দেবেন, তাঁকেই নীতিনির্ধারণী আলোচনা থেকে দূরে রাখার বিষয়টি প্রশাসনের ভেতরের ফাটলকে স্পষ্ট করেছে।
এদিকে যুদ্ধের দামামার মধ্যেই কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। তবে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি থাকলেও নিজেদের মৌলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে কোনো ছাড় দেবে না। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দেওয়া বন্ধের যে দাবি যুক্তরাষ্ট্র তুলেছে, তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান।








