‘বেঁচে থাকতে সবাইতো খোঁজ খবর নিতেন। অসুস্থ হয়ে যখন বাসায় বসে গেলেন, তখনও অনেকেই খোঁজ নিয়েছেন। মানুষটা মরে গেলো, আর সাথে সাথেই তার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলো। কেউ তাকে মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করলেন না। এতো দ্রুত সবাই তাকে ভুলে গেলো!’
কিছুটা ক্ষোভ আর হতাশা মিশ্রিত কণ্ঠে এভাবেই স্বামী ও কিংবদন্তী অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামানকে নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনকে বলছিলেন স্ত্রী রুনি জামান।
চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে বিদায় নেন চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান। তিনি আজ নেই, তবুও থেমে নেই তার জন্মদিন গণনার ক্ষণ। শুক্রবার (১০ সেপ্টেম্বর) তার জন্মদিন। মৃত্যুর পর প্রথম জন্মদিন এই কিংবদন্তীর।
কোনো আয়োজন রাখছেন কিনা, জানতেই যোগাযোগ করা হয় এ টি এম শামসুজ্জামান পত্নী রুনি জামানের সাথে। তিনি জানান, প্রিয় মানুষের জন্মদিনে পারিবারিকভাবে তারা স্বল্পপরিসরে আয়োজন রেখেছেন। দুপুরে এতিম ছেলেমেয়েদের খাওয়ানোর ব্যবস্থাও রেখেছেন।
বেঁচে থাকলে অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের এই অভিনেতা ৮০ পূর্ণ করে পা রাখতে ৮১ বছরে! এমন দিনে স্ত্রী রুনি জামানের কণ্ঠে থেকে থেকেই যেনো দীর্ঘশ্বাস! প্রিয় মানুষটির নানা স্মৃতির কথা মনে করছেন তিনি। জীবিত এ টি এম শামসুজ্জামানকে ঘিরে মানুষের উল্লাসের কথাও মনে স্মরণ করছেন!
বললেন, “নাটক, সিনেমার জন্য সারাটা জীবন দিয়ে গেলেন। নিজের স্বার্থে কিচ্ছু চিন্তা করেননি, নাটক সিনেমাকে সব দিয়ে গেলেন। অথচ তার মৃত্যুর পর কেউ সামান্য খোঁজ খবরটাও নিলেন না। অন্তত নাটক সিনেমার মানুষরাতো তার পরিবারের খোঁজ খবর নিতে পারতেন! হয়তো এটাই বাস্তবতা।”
অভিনয় ছাড়াও এ টি এম শামসুজ্জামান একাধারে পরিচালক, কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপকার ও গল্পকার। ১৯৪১ সালের এই দিনে নোয়াখালীর দৌলতপুরে গুণী এই শিল্পী জন্মগ্রহণ করেন।
এ টি এম শামসুজ্জামান অভিনয়ের জন্য পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। শিল্পকলায় অবদানের জন্য ২০১৫ সালে পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদক।
এ টি এম শামসুজ্জামানের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলার ভোলাকোটের বড় বাড়ি আর ঢাকায় থাকতেন দেবেন্দ্রনাথ দাস লেনে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার পগোজ স্কুল, কলেজিয়েট স্কুল, রাজশাহীর লোকনাথ হাই স্কুলে।
পগোজ স্কুলে তার বন্ধু ছিল আরেক অভিনেতা প্রবীর মিত্র। ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন ময়মনসিংহ সিটি কলেজিয়েট হাই স্কুল থেকে। তারপর জগন্নাথ কলেজ ভর্তি হন। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে এ টি এম শামসুজ্জামান সবার বড়।
১৯৬১ সালে পরিচালক উদয়ন চৌধুরীর ‘বিষকন্যা’ চলচ্চিত্রে সহকারি পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্র জীবন শুরু করেন। প্রথম কাহিনী ও চিত্রনাট্য লিখেছেন ‘জলছবি’ চলচ্চিত্রের জন্য। ছবির পরিচালক ছিলেন নারায়ণ ঘোষ মিতা, এ ছবির মাধ্যমেই অভিনেতা ফারুকের চলচ্চিত্রে অভিষেক।
শতাধিক চিত্রনাট্য ও কাহিনী লিখেছেন তিনি। প্রথম দিকে কৌতুক অভিনেতা হিসেবে চলচ্চিত্র জীবন শুরু করলেও ১৯৬৫ সালে অভিনেতা হিসেবে চলচ্চিত্র পর্দায় আগমন তার। ১৯৭৬ সালে চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমণি’ চলচ্চিত্রে খলনায়কের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন তিনি।
১৯৮৭ সালে কাজী হায়াত পরিচালিত ‘দায়ী কে?’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। তিনি রেদওয়ান রনি পরিচালিত চোরাবালিতে অভিনয় করেন ও শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব-চরিত্রে অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।








