মানুষ ভুল করে। ভুলের পর অনুশোচনা হয়, আর সেই অনুশোচনা থেকেই জন্ম নেয় ক্ষমা চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। ইসলামে সেই ক্ষমা প্রার্থনার সবচেয়ে পরিচিত উচ্চারণ “আস্তাগফিরুল্লাহ”। মাত্র একটি শব্দ, অথচ এর ইতিহাস বিস্তৃত মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন পর্যন্ত।
ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রথম মানুষ হযরত আদম (আ.)। আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার পর তিনি নিজের ভুল উপলব্ধি করেন। অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কুরআনে সেই তওবার কথা উল্লেখ রয়েছে, আর সেখান থেকেই মানবজাতি শিখে ভুল হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর দরজা কখনো বন্ধ হয় না।
এরপর যুগে যুগে প্রতিটি নবী তার জাতিকে আল্লাহর কাছে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। হযরত নূহ (আ.) তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল।” কুরআনে আরও উল্লেখ রয়েছে, ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহ রহমত, বরকত, রিজিক ও শান্তির সুসংবাদ দিয়েছেন।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও প্রতিদিন বহুবার আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করতেন। সহিহ হাদিসে এসেছে, তিনি দিনে সত্তুরেরও বেশি, অন্য বর্ণনায় একশোবার পর্যন্ত ইস্তিগফার করতেন। এর মাধ্যমে তিনি উম্মতকে শিখিয়েছেন ইস্তিগফার কেবল গুনাহের জন্য নয়, এটি আল্লাহর প্রতি বিনয়, কৃতজ্ঞতা এবং আত্মশুদ্ধিরও প্রকাশ।
ইসলামের ইতিহাসে সাহাবি, তাবেয়ী এবং পরবর্তী যুগের মনীষীরাও ইস্তিগফারকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়েছিলেন। দুঃসময়, সংকট কিংবা সুখের মুহূর্ত প্রতিটি অবস্থায় তারা আল্লাহর দিকে ফিরে যেতেন এই একটি বাক্যের মাধ্যমে।
“আস্তাগফিরুল্লাহ” শব্দটি আরবি “গাফারা” ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ ঢেকে দেওয়া বা ক্ষমা করা। অর্থাৎ, একজন বান্দা যখন “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলেন, তখন তিনি শুধু নিজের ভুলের ক্ষমাই চান না; বরং আল্লাহর রহমত, সুরক্ষা এবং নতুনভাবে জীবন শুরু করার সুযোগও প্রার্থনা করেন।
আজকের ব্যস্ত জীবনে এই ছোট্ট যিকির আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের ভুল হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু ভুলের পর আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়াই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি। কারণ ইসলামের শিক্ষা হলো, আন্তরিক তওবার মাধ্যমে বান্দা যতবার ফিরে আসবে, আল্লাহর রহমতের দরজাও ততবার তার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
হয়তো এ কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের ঠোঁটে একই শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়েছে “আস্তাগফিরুল্লাহ”। একটি শব্দ, যা অনুশোচনা শেখায়, একটি দোয়া, যা আশা জাগায়, আর একটি ইতিহাস, যা মানুষকে বারবার আল্লাহর কাছেই ফিরিয়ে নিয়ে যায়।







