ভূমি শুধু একটি সম্পদ নয়; এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। জন্ম, উত্তরাধিকার, পরিবারিক সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা—সবকিছুই ভূমির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ভূমি প্রশাসন জটিলতা, বিলম্ব, দুর্নীতি এবং প্রক্রিয়াগত অনিয়মের জন্য সমালোচিত। এই সমস্যার মোকাবেলায় এবং নাগরিকদের জন্য স্বচ্ছ ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে এ এস এম সালেহ আহমেদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
তিনি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল রূপান্তরের অন্যতম নীতি নির্ধারক এবং বাস্তবায়নকারী, যিনি শুধু প্রযুক্তি নয়, জনসেবা ও প্রশাসনিক কার্যকারিতার সমন্বয় করে চলেছেন। দক্ষ এবং অভিজ্ঞ কর্মকর্তা হিসেবে এ এস এম সালেহ আহমেদ ভূমি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব পদে তাঁর দায়িত্ব পালন করছেন। ভূমি ব্যবস্থাপনার ঐতিহাসিক জটিলতাকে কাটিয়ে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহি ব্যবস্থার দিকে দেশের ভূমি প্রশাসনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
তাঁর নেতৃত্ব, বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে ভূমি সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টায় এক নতুন দিকনির্দেশনা যোগ করেছে।
এ এস এম সালেহ আহমেদ বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ৮৫ ব্যাচের একজন চৌকস কর্মকর্তা। সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর তাঁকে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব পদে পদায়ন করা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই নিয়োগ কার্যকর হয়।
অবসরপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তাকে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া তাঁর অভিজ্ঞতা, কর্মপ্রচেষ্টা এবং পেশাদারিত্বের প্রতি সরকারের আস্থার প্রতিফলন বলে মনে করা হয়। তাঁর এই পুনর্নিয়োগের উদ্দেশ্য ছিল ভূমি প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের নেতিবাচক ভাবমূর্তি দূর করে তৃণমূল মানুষের জন্য দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
তাঁর মতে, ভূমি মানুষের জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয়, তাই সঠিক ভূমি ব্যবস্থাপনা একটি দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জ্যেষ্ঠ সচিব হিসেবে, এ এস এম সালেহ আহমেদ ভূমি ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল রূপান্তরের একজন অন্যতম প্রধান কারিগর। তিনি মনে করেন, একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য।
ইউসিবি টু দ্যা পয়েন্ট অনুষ্ঠানে তিনি ভূমি সেবার চারটি মৌলিক দিক তুলে ধরেন ভূমি উন্নয়ন কর, মিউটেশন (নামজারি), পর্চা সংগ্রহ এবং নকশা বা ম্যাপ সংগ্রহ।
তাঁর মতে, এই চারটি সেবাই ইতোমধ্যে অনলাইন-ভিত্তিক এবং ডিজিটালাইজড করা হয়েছে ।
রাজু আলীমের প্রযোজনায় টক শো ‘টু দ্য পয়েন্ট’-এ তিনি তুলে ধরেছেন, বাংলাদেশের ভূমি সেবার চারটি মৌলিক সেবা—ভূমি উন্নয়ন কর, মিউটেশন (নামজারি), পর্চা সংগ্রহ এবং নকশা বা ম্যাপ সংগ্রহ—কে ডিজিটালাইজ করা হয়েছে। এই চারটি সেবা নাগরিকদের হাতে সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন আবেদন এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল পেমেন্ট ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন।
এই উদ্যোগ শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি করছে না বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও স্বস্তি এনেছে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, প্রায়শই নাগরিকরা পূর্বে সারাদিন ভোগান্তিতে পড়তেন—দূর্নীতি, অনিচ্ছুক কর্মকর্তার দ্বন্দ্ব, জটিল কাগজপত্রের কারণে—যা এখন ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে অনেকাংশে কমে এসেছে।
এ এস এম সালেহ আহমেদের নেতৃত্বে মন্ত্রণালয় নতুন ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের নাগরিকরা এখন অনলাইনে আবেদন করতে পারছে এবং সেবা গ্রহণের জন্য নির্ধারিত ফি সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে। এটি দুর্নীতি হ্রাসের একটি বড় পদক্ষেপ। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মিউটেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হোল্ডিং নম্বর তৈরি হওয়ার মাধ্যমে ভূমি কর পরিশোধও সহজ হয়েছে।
বর্তমানে ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালু করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হবে। এই ধরণের ডিজিটাল অটোমেশন শুধু প্রশাসনিক কাজকে স্বচ্ছ করে তুলছে না, বরং নাগরিকদের জন্য সময় ও অর্থ সাশ্রয় নিশ্চিত করছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা যা সালেহ আহমেদ সমাধান করছেন, তা হলো ডিজিটাল বিভাজন। দেশের সকল নাগরিকের কাছে ডিজিটাল ডিভাইস নেই বা ব্যবহারিক দক্ষতা নেই। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তিনি কল সেন্টার চালু করেছেন—১৬১২২ নম্বর, যা ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। পাশাপাশি, ভূমি ভবনের নিচতলায় একটি নাগরিক সেবা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে বিনা মূল্যে সাহায্য প্রদান করা হয়। জেলা পর্যায়েও তিনি নাগরিক সেবা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করেছেন। আরও বড় উদ্যোগ হিসেবে তিনি ‘ল্যান্ড সার্ভিসেস ফ্যাসিলিটি সেন্টার’ (এলএসএফসি) বা ভূমি সেবা সহায়তা কেন্দ্র চালু করেছেন। এই কেন্দ্রগুলিতে প্রশিক্ষিত সহায়তাকারীরা সরাসরি নাগরিকদের সঙ্গে কাজ করছেন, যাদের হাতে ডিজিটাল দক্ষতা আছে, এমনকি যারা সাধারণ শিক্ষা গ্রহণে সীমাবদ্ধ, তাদেরও কাজে লাগানো হচ্ছে।
এ এস এম সালেহ আহমেদের নির্দেশিকা অনুযায়ী, জেলা প্রশাসকরা কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রমের সরাসরি তত্ত্বাবধান করছেন। তারা লাইসেন্স প্রদান বা বাতিল করার ক্ষমতা রাখেন এবং স্থানীয় অভিযোগ থাকলে তা সমাধান করছেন। বর্তমানে ৪৮টি জেলায় ৪২৩টি কেন্দ্র কার্যকর হয়েছে এবং আরও ১১টি জেলায় কাজ চলছে।
তিনি বিশ্বাস করেন, আগামী এক বছরের মধ্যে সারাদেশে কয়েক হাজার কেন্দ্র স্থাপন সম্ভব হবে। নাগরিকরা একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে তাদের নিকটস্থ এলএসএফসি খুঁজে নিতে পারবে। এই উদ্যোগ শুধু প্রশাসনিক সুবিধা নয়; এটি জনগণকে তাদের দরজার কাছে প্রযুক্তি এবং সেবা পৌঁছে দিচ্ছে, যা ডিজিটাল বিভাজন দূর করতে কার্যকর।
ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের সঙ্গে সাথে তিনি দুর্নীতি হ্রাস এবং জাল দলিল নির্মাণ প্রতিরোধে বিশেষ গুরুত্ব দেন। জমি বিক্রয় ও হস্তান্তরের সময় নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হওয়ায় ভুয়া দলিল তৈরি করা এখন কঠিন। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ভুয়া দলিলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তার নেতৃত্বে ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ও কমেনি, বরং বৃদ্ধি পেয়েছে।
ডিসেম্বর থেকে মার্চে কিছু সার্ভার সমস্যা থাকলেও, ৩০শে জুন পর্যন্ত আদায়কৃত ভূমি করের পরিমাণ ছিল সর্বকালের সর্বোচ্চ—১১৪৫ কোটি টাকা। বিশেষ করে জুন মাসে এক মাসে ৬৬৬ কোটি টাকা আদায়ের ঘটনা এটিকে প্রমাণ করে।
তিনি মনে করেন, ডিজিটাল সেবা ও স্বচ্ছ রেকর্ড ব্যবস্থা মামলা-মোকদ্দমা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভূমি সংক্রান্ত সমস্যার অনেকটাই পারিবারিক পর্যায় থেকে উদ্ভূত।
এ এস এম সালেহ আহমেদ বিশ্বাস করেন, যদি ওয়ারিশ সনদ সঠিকভাবে ডিজিটাল করা হয় এবং উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগাভাগি সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়, তাহলে মামলা কমে যাবে। এছাড়া, নিবন্ধন ও মিউটেশন প্রক্রিয়া যদি একীভূত করা যায়, তাহলে জাল দলিলের কারণে সৃষ্ট ঝামেলা প্রায় শূন্যে নেমে আসবে।
সালেহ আহমেদ ডিজিটালাইজেশনকে শুধু প্রযুক্তি হিসেবে দেখেন না; এটি একটি সামাজিক এবং প্রশাসনিক সংস্কার।
তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, নাগরিকরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সিংগেল সাইন অন এর মাধ্যমে সব সেবা গ্রহণ করতে পারবে। অনলাইন পর্চার সেবা ডাক বিভাগের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে বাড়ানো হয়েছে। যাতে আবেদনকারী সার্টিফায়ড কপি তার ঠিকানায় সরাসরি পাবেন। প্রবাসীরাও এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন। এই ধরণের উদ্যোগ শুধুমাত্র নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি করছে না, বরং সরকারি সেবা প্রদানে স্বচ্ছতা এবং দক্ষতা প্রতিষ্ঠা করছে।
এ এস এম সালেহ আহমেদ-এর কার্যক্রমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জনবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি জনগণকে সেবার কেন্দ্রে রাখেন এবং প্রযুক্তিকে তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন, শুধু অনলাইন সিস্টেম যথেষ্ট নয়; মানুষের সচেতনতা, স্থানীয় সহায়তা এবং সহজলভ্যতা জরুরি। এই বাস্তববুদ্ধি এবং প্রশাসনিক দক্ষতা মিলে ভূমি প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তরকে সফল ও টেকসই করেছে।
সার্বিকভাবে, এ এস এম সালেহ আহমেদ বাংলাদেশের ভূমি প্রশাসনে ডিজিটালাইজেশন, স্বচ্ছতা, জনবান্ধব সেবা এবং সামাজিক প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতীক। তার উদ্যোগে নাগরিকরা ঘরে বসে সেবা পাচ্ছেন, দূর্নীতি কমছে, রাজস্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ভূমি-সম্পর্কিত সমস্যার মাত্রা কমছে।
ভবিষ্যতে এই কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হলে, দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, স্বচ্ছ এবং নাগরিককেন্দ্রিক সিস্টেমে রূপান্তরিত হবে।







