বাংলাদেশের ভাস্কর্যশিল্পের পথিকৃত, আধুনিকতার প্রতীক এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আলোচিত শিল্পী নভেরা আহমেদকে স্মরণ করে রাজধানীর বেঙ্গল শিল্পালয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘নভেরা স্মৃতির অভিযাত্রা’। যে আয়োজনের মূল আকর্ষণ ছিলো এই ভাস্করের উপর নির্মিত তিনটি বিশেষ ডকুফিল্ম প্রদর্শনী!
তিনটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গিতে নির্মিত তথ্যচিত্রে উপস্থিত দর্শকরা নভেরা আহমেদের শিল্পভাবনা, জীবনযাপন ও আত্মনিবেদনকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগ পান।
এই স্মরণীয় প্রদর্শনীতে দেখানো হয় তিনজন নির্মাতার নির্মিত তিনটি ডকুফিল্ম। এরমধ্যে ছিলো বেশ ক’বছর আগে নির্মিত নির্মাতা এন রাশেদ চৌধুরীর ‘ন হন্যতে’, শিবু কুমার শীলের ‘নভেরা’ এবং অতি সম্প্রতি নির্মিত অনন্যা রুমার ‘নভেরা: এক্সপেডিশন টু নস্টালজিয়া’।
তিনটি তথ্যচিত্রেই উঠে এসেছে নভেরার শিল্পযাত্রা, তার কর্মপ্রচেষ্টা, প্যারিস থেকে ঢাকা— তার শিল্প-জীবনের রূপরেখা, এবং একটি অন্তর্মুখী কিন্তু শক্তিশালী সৃজনশীল মননের প্রতিচ্ছবি। নির্মাতারা প্রত্যেকে নিজস্ব ভঙ্গিতে নভেরার শিল্পচিন্তা, একাকীত্ব, সমাজ-নিরপেক্ষতা ও নারীত্বের দৃষ্টিভঙ্গিকে অনুসন্ধান করেছেন।
বেঙ্গলের প্রেক্ষাগৃহে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে হল ভর্তি দর্শক উপস্থিত ছিলেন। যার মধ্যে ছিলেন শিল্পী, গবেষক, ছাত্রছাত্রী ও আগ্রহী নভেরাপ্রেমী সাধারণ দর্শক।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা নভেরাকে নিয়ে আরও জানতে চাই। তার কাজ আরও দেখতে চাই। তার কাজগুলো মানুষের কাছে কীভাবে পৌঁছানো যায়, সেই চেষ্টা করছি। বেঙ্গল ও চ্যানেল আইয়ের উদ্যোগে এই আয়োজন তারই একটি প্রয়াসমাত্র।’
প্রদর্শনী শেষে শিল্পী অধ্যাপক লালারুখ সেলিম বলেন, ‘নভেরাকে নিয়ে নব্বই দশক থেকে জানার বা বোঝার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটি এখনো চলমান। তাকে ও তার কাজ জানার চেষ্টা করছি, বোঝার চেষ্টা করছি। তার কাজ নিয়ে এখনো বিশদভাবে ভাবার ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। নভেরার নাটকীয় জীবন ছাপিয়ে তার কাজ নিয়ে আরও কাজ হতে পারে। সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।’
প্রদর্শীত ডকুফিল্মগুলো নিয়ে উপস্থিত দর্শকদের ভাষ্য,“নভেরা আহমেদের কাজের গভীরতা এবং তার আত্মিক দৃষ্টিভঙ্গিকে এই ডকুফিল্মগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে উপস্থাপন করেছে। এগুলো শুধু তথ্যচিত্র নয়, শিল্পীর একান্ত অভিজ্ঞতা ও সময়ের স্রোতে বিলীন হয়ে যাওয়া এক সৃজনপ্রতিভার পুনঃআবিষ্কার।”
এরমধ্যে অনন্যা রুমার নির্মিত ‘নভেরা: এক্সপেডিশন টু নস্টালজিয়া’র অভিজ্ঞতা দর্শকদের জন্য ছিলো একেবারে টাটকা ও ব্যতিক্রম। ডকুফিল্মটির স্বতন্ত্র মনোভাব, অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিভঙ্গি এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের কারণে বিশেষভাবে দর্শকদের নজর কাড়ে। এ বছরের জানুয়ারিতে নির্মাতা অনন্যা রুমা ফ্রান্সে গিয়ে এই তথ্যচিত্রের চিত্রগ্রহণ করেন— একান্তভাবে নভেরা আহমেদের জীবন, কর্ম এবং আত্মিক যাত্রার অন্বেষণেই তথ্যচিত্রে ফুটে উঠেছে।
এই ডকুফিল্ম নির্মাণে অনন্যা রুমাকে সহায়তা করেন ‘নভেরা বিভুঁইয়ে স্বভূমে’ বইয়ের লেখক, গবেষক ও প্যারিস প্রবাসী আনা ইসলাম। ডকুফিল্মের শুরুতেই এই তথ্য দিয়ে শুরু হয় নভেরা- স্মৃতির অভিযাত্রা। ডকুফিল্মটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো— নভেরা আহমেদের স্বামী গ্রেগরি দ্য বুনস এবং দীর্ঘদিন ধরে নভেরাকে দেখাশোনা করে আসা এক ঘনিষ্ঠ সেবিকার সাক্ষাৎকার। তারা দুজনেই নভেরা সম্পর্কে একান্ত স্মৃতিচারণ করেন, যা ডকুফিল্মটিতে এক মানবিক, অন্তর্মুখী মাত্রা এনে দেয়। তাদের বিবৃতিতে উঠে আসে নভেরার জীবনের শেষ অধ্যায়ের কথা— নিঃসঙ্গতা, শিল্পচর্চা থেকে এবং নীরব আত্মমগ্নতা।

সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ হলো— প্যারিসে নভেরার নামে প্রতিষ্ঠিত একটি ছোট্ট জাদুঘরের অস্তিত্ব। যেখানে তার বেশকিছু ভাস্কর্য, স্কেচ এবং ব্যক্তিগত সংগ্রহ সংরক্ষিত রয়েছে। অনন্যা রুমার ক্যামেরার সাথে সাথে যেন নভেরার নামে সেই জাদুঘরটি দর্শকও পরিভ্রমণ করেন! এমনকি জাদুঘর থেকে দর্শককে ডকুফিল্মের শেষে নভেরার সমাধিস্থলেও নিয়ে যান নির্মাতা। নিঃসন্দেহে নভেরাপ্রেমীদের জন্য এই যাত্রা নতুন এবং রোমাঞ্চকর!
তথ্যচিত্রের মূল্যবান সংযোজন হিসেবে অনন্যা রুমা পান নভেরার মৃত্যুর কিছুদিন আগে একজন ফরাসি স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাকে দেওয়া একটি ভিডিও সাক্ষাৎকারের ফুটেজ। এই অভাবনীয় প্রাপ্তি তথ্যচিত্রটিকে পরিণত করেছে এক দুর্লভ আর্কাইভে— যেখানে শিল্পীর নিজস্ব কণ্ঠে, নিজস্ব ভাষ্যে উঠে এসেছে তার চেতনা, সংগ্রাম এবং শিল্পদর্শন। বিশেষ করে শহীদ মিনারের নকশাকার হিসেবে তার থাকা না থাকা নিয়ে যে দ্বন্দ্ব, সেটারও যেন সুরাহা হয় নভেরার ভাষ্যে!

‘নভেরা: এক্সপেডিশন টু নস্টালজিয়া’ কেবল একটি তথ্যচিত্র নয়, বরং এটি এক সময়ের, এক নারীর, এক শিল্পমানসের অন্তরাল অভিযাত্রা। নির্মাতা অনন্যা রুমা নিজেই বলেন,“নভেরার মুখোমুখি না হতে পারলেও তার ছায়ার মধ্যে হাঁটার চেষ্টা করেছি। এই ডকু আমার জন্য এক ধরণের আত্মিক সংযোগ।”
২৫ মিনিট ব্যাপ্তীর এই ডকুফিল্মের শেষ দিকে নির্মাতা নভেরাপ্রেমীদের জন্য রেখে যান প্রতিশ্রুতি। জানান— নভেরাকে নিয়ে এই যাত্রা শেষ নয়, বরং শুরু মাত্র। এক পূর্ণদৈর্ঘ্য অভিযাত্রায় ফিরে আসবেন প্যারিসসহ দেশ বিদেশের অলিগলিতে নভেরার শিল্প, তার নিঃসঙ্গতা, তার নীরব দ্রোহের অভিযাত্রা নিয়ে।








