প্রতিবছর কৃষিজমি হ্রাস, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আকস্মিক বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ইত্যাদি বৈরী প্রকৃতিতেও ২২টি ফসল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম ১০ দেশের মধ্যে অবস্থান করে নিয়েছে। খাদ্যশস্য উৎপাদনে বিশ্বের গড় উৎপাদন পেছনে ফেলে ক্রমেই এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। বর্তমান ডিজিটাল যুগে বিশ্বের উন্নত দেশের মত করে বাংলাদেশও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে স্মার্ট কৃষি কার্যক্রম শুরু করে ধীরে ধীরে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করছে।
কম্পিউটার বিজ্ঞানের ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (Artificial Intelligence বা সংক্ষেপে AI)’ -এর বাংলা অর্থ ’কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চীন, ভারতসহ অনেক দেশ ইতোমধ্যে কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুরু করে সহজে কৃষি উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশও অনুরুপভাবে কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির বহুবিধ ব্যবহার করে সহজে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কৃষিতে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (Artificial Intelligence বা ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’-এর সাথে ইন্টারনেট অফ থিংস (Internet of Things) যুক্ত করে বর্তমান কৃষিকে বলা হচ্ছে স্মার্ট এগ্রিকালচার (Smart Agriculture)।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে ‘মদিনা টেক লিমিটেড’ নামক বাংলাদেশে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একদল তরুণ আইটি ইঞ্জিনিয়ার ও কৃষিবিদগণ যুগান্তকারী ‘ডা. চাষী (Dr. Chashi)’ মোবাইল অ্যাপ গুগল প্লে-স্টোরে রিলিজ করেছেন। ‘ডা. চাষী’নামক এ অ্যাপ দিয়ে ফসলের আক্রান্ত স্থানের ছবি তুলে ছাদ বাগান এবং মাঠ ফসলের রোগ ও পোকামাকড়ের সঠিক তথ্য ও সমাধান জানতে পারা যায়।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট (ব্রি) ধানের রোগবালাই চিহ্নিতকরণের লক্ষ্যে ‘রাইস সলিউশন’ (সেন্সরভিত্তিক ধানের বালাই ব্যবস্থাপনা) নামের একটি মোবাইল অ্যাপস উদ্বোধন করেছে, যা ধানের ক্ষেত থেকেই আক্রান্ত ধান গাছের ছবি দেখে রোগ চিহ্নিত করতে সক্ষম।
বাংলাদেশ সরকারের প্রতিরক্ষা ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট, নেদারল্যান্ডসের টুয়েন্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্র যৌথভাবে ‘স্টারস’প্রকল্পের আওতায় দেশের কৃষি গবেষণায় আধুনিক, উন্নত ও কার্যকর প্রযুক্তি হিসেবে ড্রোন ব্যবহার করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ও ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্বলিত ড্রোন কাস্টমাইজ করে ইন্টিগ্রেট করা যায়। ড্রোন একবার ফসলের ক্ষেতের উপর দিয়ে উড়ে গেলে ঐ এলাকার সার্বিক অবস্থা জানাতে সক্ষম। ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসলের মাঠের আর্দ্রতা পরিমাপ, ফসলে উপাদানের উপস্থিতি নির্ধারণ, শস্যরোপণ ডিজাইন, বীজ বপন, কীটনাশক স্প্রে, সেচ মনিটরিং, ফসলের সার্বিক মনিটরিং, মাটির পুষ্টি অবস্থা, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা, পিএইচ, লবণাক্ততা, ফসলের রোগ ও পোকামাকড়ের উপস্থিতি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, আগাম নির্দেশনা, সম্ভাব্য ফলনের পূর্ভাবাস, ইত্যাদি বিষয়াবলী জানা যায় এবং সেমতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।
কৃষি খাতে উন্নয়নের লক্ষ্যে চীনা দূতাবাসের আর্থিক সহায়তায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে ‘ই-ভিলেজ’নামক প্রকল্প বাস্তবাযন করছে। এ প্রকল্পে সেন্সরের মাধ্যমে ফসলি জমির মাটির স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানা যায়, ফসল সর্বক্ষণ পর্যবেক্ষণে রেখে ফসলে কোন রোগ দেখা দিয়েছে কি না তা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সাথে সাথেই জানা যায় এবং সেই সাথে অ্যাপ থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে কৃষক তার উৎপাদন খরচ কমিয়ে সর্বোচ্চ ফলন নিশ্চিত করতে পারছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রবিন্ধকতার যুক্তিযুক্ত কারণ সনাক্ত করে তার প্রতিকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা সম্ভব। নিম্নে এসকল বিষয়ের কিছু উদাহরণ উপস্থাপন করা হলো।
• ফসল মনিটরিং: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ড্রোন এবং স্যাটেলাইট চিত্রগুলি ফসলের স্বাস্থ্য নিরীক্ষণ করতে এবং রোগ বা কীটপতঙ্গ প্রাথমিকভাবে সনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়।
• আবহাওয়ার পূর্বাভাস: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল সঠিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদান করতে পারে, কৃষকদের কার্যক্রম পরিকল্পনা করতে এবং প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে ফসল রক্ষা করতে সাহায্য করে।
• শস্যের রোগ ও পোকামাকড় শনাক্তকরণ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক চিত্র শনাক্তকরণ সিস্টেম ফসলের রোগ ও পোকামাকড় শনাক্ত করতে পারে, যাতে সময়মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়।
• মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অ্যালগরিদম মাটির তথ্য বিশ্লেষণ করে উপযুক্ত মাটি অনুযায়ী ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় সার সুপারিশ করতে পারে। ফলে সারের ব্যবহার, খরচ ও পরিবেশগত প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।
• সেচ ব্যবস্থাপনা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে রিয়েল-টাইম আবহাওয়া অনুযায়ী মাটির প্রয়োজনীয় পানির পরিমান নির্ধারণ করতে পারে। ফলে পানির ব্যবহার, খরচ ও পরিবেশগত প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।
• শস্যের ফলনের পূর্বাভাস: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল প্রাক্তন তথ্য এবং বর্তমান অবস্থার উপর ভিত্তি করে ফসলের ফলনের পূর্বাভাস প্রদান করতে পারে।
• প্রাণীসম্পদ ব্যবস্থাপনা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত সেন্সর গবাদি পশু ও হাসমুরগীর স্বাস্থ্য, তাপমাত্রা, পরিবেশ ও আচরণ ট্র্যাক করে দ্রুত প্রয়োজনীয় সুপারিশ করে এগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধি করতে সক্ষম।
• মৎস্যচাষ ব্যবস্থাপনা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত সেন্সর মৎস্য খামারের পানির গুনাগুন, তাপমাত্রা, পিএইচ, ঘোলাত্ব ও পরিবেশ এবং মাছের স্বাস্থ্য, ঘনত্ব, ও বৃদ্ধি পর্যায় অনুযায়ী আচরণ ট্র্যাক করে দ্রুত প্রয়োজনীয় সুপারিশ করে এগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধি করতে সক্ষম।
এছাড়াও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন বিভিন্ন রকমের মোবাইল এপস্ যেমন ’কৃষকের জানালা’ কৃষকের ডিজিাল ঠিকানা’, ’প্লান্ট ডক্টর’ ’প্লান্টিক্স’ ’ফসলী’ ‘বামিস’ ইত্যাদি ব্যবহার করে ফসলের রোগবালাই, পোকামাকড় সনাক্ত করণ ও নিয়ন্ত্রন, বীজ বপন, চারা রোপণ, অগাছা দমন, ফসল কাটা এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশে ডিজিটাল কার্যকরণের ফলেই এদেশের কৃষিতে এধরণের সাফল্য অর্জিত হয়েছে। কৃষির এ সাফল্য ধরে রেখে কৃষিকে উৎপাদনমূখী লাভজনক খাতে রূপ দিতে বর্তমান সরকারের ধারাবাহিকতা অপরিহার্য।
লেখক: প্রফেসর, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








