বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকে আসা বার্তা সবসময়ই দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। তাই বুধবার (৫ নভেম্বর) সেনা সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সেনা নেতৃত্বের বক্তব্য শুধু একটি প্রশাসনিক অবস্থান নয়, বরং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্থিতিশীলতার একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবেই প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাইনুর রহমান, জিওসি আর্টডক, সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করে বলেছেন— “আমরাও চাই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হোক এবং আমরা সেনানিবাসে ফিরে যাই।” এই একটি বাক্যে সেনাবাহিনীর অবস্থান যেমন স্পষ্ট, তেমনি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে তাদের প্রত্যাশাও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ, সেনাবাহিনী চায় সরকার ঘোষিত রূপরেখা অনুযায়ী অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হোক, যাতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।
এই বক্তব্যের তাৎপর্য গভীর। কারণ, গত ১৫ মাস ধরে সেনাবাহিনী একটি অস্বাভাবিক ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে—যেখানে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক অস্থিরতা এবং আইনশৃঙ্খলার জটিলতা একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই সময় সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল প্রশাসনিক সহায়তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ও দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। সেনাপ্রধান ও সিনিয়র নেতৃত্বের প্রতি শতভাগ আনুগত্যের কথা প্রকাশ করে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমান বলেন, “যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন সেনাবাহিনী আরও ঐক্যবদ্ধ, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং ভ্রাতৃত্ববোধে দৃঢ়।”
এই বক্তব্য শুধু অভ্যন্তরীণ ঐক্যের ঘোষণা নয়—এটি একটি প্রতিরোধও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেনাবাহিনীকে ঘিরে চলমান নানা গুজব ও বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক উত্তর।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের একটি সবচেয়ে পেশাদার ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বরাবরই পরিচিত। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যখনই জাতীয় সংকট এসেছে, তখনই তারা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে—কখনও দুর্যোগ মোকাবিলায়, কখনও শান্তিরক্ষা অভিযানে, আবার কখনও রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সংবিধান অনুযায়ী সহায়তার ভূমিকা রেখেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটেও সেনাবাহিনী সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাই রক্ষা করছে। তাদের বক্তব্যে কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাতের ইঙ্গিত নেই; বরং সেখানে আছে দেশের স্থিতিশীলতা ও জনগণের কল্যাণের প্রতি দায়বদ্ধতা।
লে. জেনারেল মাইনুর রহমানের বক্তব্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—তিনি সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিঘ্নিত হওয়ার কথা উল্লেখ করলেও সেটিকে কোনো অভিযোগ হিসেবে নয়, বরং পেশাদার বাস্তবতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। এতে বোঝা যায়, সেনাবাহিনী তার দায়িত্বকে বোঝে, এবং দেশের প্রয়োজনে নিজেকে অভিযোজিত করতে প্রস্তুত। তাদের মূল লক্ষ্য পরিষ্কার—যত দ্রুত সম্ভব একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ স্থিতিশীল হয়ে উঠুক, যাতে তারা পুনরায় তাদের পেশাগত কর্মক্ষেত্রে, অর্থাৎ প্রতিরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে ফিরে যেতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল নির্বাচনী প্রস্তুতি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন জানান, নির্বাচনকালীন সময়ে ৯০ হাজার থেকে এক লক্ষ সেনাসদস্য মাঠ পর্যায়ে মোতায়েন থাকবে—যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাধিক। জেলা, উপজেলা ও আসনভিত্তিক ক্যাম্প স্থাপনের মাধ্যমে তারা নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করবে। এই প্রস্তুতি সেনাবাহিনীর সুসংগঠিত কাঠামো ও তাদের প্রশাসনিক দক্ষতারই প্রমাণ।
নির্বাচনকালীন সময়ে সেনাবাহিনীর এই উপস্থিতি আসলে জনগণের কাছে আস্থার বার্তা বহন করে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, সেনাবাহিনীর উপস্থিতি সব সময় ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ জাগিয়ে তোলে, নির্বাচনী সহিংসতা রোধ করে এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে একটি গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে রাখে। ফলে সেনাবাহিনীর ভূমিকা এখানে কেবল নিরাপত্তারক্ষী নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সুরক্ষারক্ষাকারী হিসেবে বিবেচ্য।
অন্যদিকে, সেনাসদর থেকে পরিষ্কার বার্তা এসেছে যে তারা সরকারের গাইডলাইন ও নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবে। অর্থাৎ, সেনাবাহিনী নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনোভাবে ‘কেন্দ্রীয় চরিত্র’ নয়—তারা হবে সহায়ক ও রক্ষাকারী বাহিনী। এই অবস্থান গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার প্রতীক।
এছাড়া, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার কিছু সেনা কর্মকর্তার প্রসঙ্গেও সেনাবাহিনী একটি দায়িত্বশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সরকার যেভাবে সঠিক মনে করে, সেভাবেই প্রক্রিয়াটি চলবে।”
এই বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে—সেনাবাহিনী কখনোই আইনের ঊর্ধ্বে নয়, এবং তারা বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারকেই প্রাধান্য দেয়। একই সঙ্গে তারা সহানুভূতির সঙ্গে গুম-খুনের শিকার পরিবারের প্রতি সংবেদনশীলতা প্রকাশ করেছে। এই দ্বিমুখী মানবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য সেনাবাহিনীর পরিণত মনোভাবের প্রতিফলন।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিবাচক অবস্থান আজ শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে তাদের অবদান বিশ্বের অন্যতম। এই প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর বর্তমান বার্তা দেশের গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—তারা চায় একটি শান্তিপূর্ণ, নির্বাচনী প্রক্রিয়া, যেখানে জনগণের ভোটের মাধ্যমে একটি প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠিত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেনাবাহিনীর এই ‘আশাবাদী নিরপেক্ষতা’ দেশের জন্য শুভ লক্ষণ। তারা যদি তাদের বর্তমান অবস্থান—অরাজনৈতিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং পেশাদার—বজায় রাখে, তবে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যাবে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষে লে. জেনারেল মাইনুর রহমানের বক্তব্যটি পুরো সেনা সদরের মনোভাবের সারসংক্ষেপ হয়ে উঠেছে—
“আমরা আশা করি নির্বাচন হলে দেশের স্থিতিশীলতা আরও ভালো হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে আরও স্বাভাবিক হবে এবং সেনাবাহিনী তখন সেনানিবাসে ফিরে যেতে পারবে।” এই প্রত্যাশা শুধু সেনাবাহিনীর নয়—এটি আসলে পুরো জাতিরও প্রত্যাশা।
একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এখন দেশের জন্য যেমন রাজনৈতিক প্রয়োজন, তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনেরও শর্ত। সেনাবাহিনী যদি তাদের ঘোষিত নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখে এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে ধীরে ধীরে সরে গিয়ে প্রতিরক্ষার স্বাভাবিক ভূমিকায় ফিরে যায়, তবে তা দেশের গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের পথকে আরও মজবুত করবে।
সেনা সদর যে বার্তা দিয়েছে, তা কেবল সেনা সদর দপ্তরের নয়—এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার প্রতি একটি আশাবাদী ঘোষণাও।
নির্বাচন যত তাড়াতাড়ি হবে, দেশ তত দ্রুত তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে—এটাই এখন সেনা সদর থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক পর্যন্ত সবার প্রত্যাশা। এক কথায়, “নির্বাচন মানেই স্থিতিশীলতা”—এই বিশ্বাসটাই এখন জাতির মূল ভরসা, এবং সেনাবাহিনী সেই বিশ্বাসের রক্ষাকবচ হিসেবে দৃঢ়ভাবে পাশে আছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক বক্তব্য শুধু একটি তাৎক্ষণিক সংবাদ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব এবং দায়িত্ববোধের প্রতিফলন। এক দশক ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আন্দোলন, দুর্যোগ ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও সেনাবাহিনী নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও নাগরিক আস্থার স্তম্ভ হিসেবে। তাদের সাম্প্রতিক ঘোষণায় যে বার্তা উঠে এসেছে, তা হলো—বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন কেবল এক প্রতিরক্ষা বাহিনী নয়, বরং একটি স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সফল বাস্তবায়নের অংশীদার হতে চায়, কোনোভাবেই বিকল্প নয়।
সেনাবাহিনী সবসময়ই জাতির সংকট মুহূর্তে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে—বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, মহামারি কিংবা সামাজিক অস্থিরতা—সব ক্ষেত্রেই তাদের নিরপেক্ষ ও দ্রুত পদক্ষেপ নাগরিক জীবনে স্থিতি ফিরিয়েছে। তাই যখন তারা বলে, “নির্বাচন হলে দেশ আরও স্থিতিশীল হবে,” তখন সেটি কেবল একটি রাজনৈতিক অভিমত নয়; বরং বাস্তব অভিজ্ঞতার নির্যাস। সেনাবাহিনী বুঝে যে, নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক বৈধতা পুনর্নির্মিত হলে প্রশাসনিক দায়িত্বে ভারসাম্য ফিরে আসবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হবে এবং তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি কার্যক্রম স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে।
একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও শৃঙ্খলার ঘোষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। গত কয়েক বছরে সামাজিক মাধ্যমে যেসব বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হয়েছে—সেগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল এই ঐক্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত বক্তব্যে সেনা সদর দৃঢ়ভাবে জানিয়েছে, “প্রত্যেক সদস্য সেনাপ্রধান ও সিনিয়র নেতৃত্বের প্রতি শতভাগ আনুগত্যশীল।” এই ঘোষণা দেশের ভেতর-বাহির উভয় মহলে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতার অংশ নয়, বরং রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতার গ্যারান্টর।
এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর মতো সংবেদনশীল বিষয়ে সেনাবাহিনীর পরিমিত প্রতিক্রিয়া তাদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতার দৃষ্টান্ত। তারা একদিকে আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেছে, অন্যদিকে সহকর্মী কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের মানবিক দিকও বিবেচনায় নিয়েছে। এই ভারসাম্যই প্রমাণ করে, সেনাবাহিনী এখন আবেগ নয়—নীতিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভ্যস্ত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেনাবাহিনী নিজেদের অবস্থান গণতন্ত্রের পরিপূরক হিসেবে ব্যাখ্যা করছে, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। তাদের বার্তা স্পষ্ট—দেশের শান্তি ও অগ্রগতি নির্বাচনের মধ্য দিয়েই সম্ভব, এবং সেই প্রক্রিয়াকে সফল করতে সেনাবাহিনী থাকবে নিরপেক্ষ কিন্তু সক্রিয় সহায়ক শক্তি হিসেবে। এই মনোভাব গণতন্ত্রের জন্য যেমন ইতিবাচক, তেমনি দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও আশাব্যঞ্জক।
সেনা সদর দপ্তরের এই ঘোষণা শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক বার্তা নয়, বরং এটি একটি আশ্বস্ত করা প্রতিশ্রুতি—যে সেনাবাহিনী দেশকে বিভাজনের পথে নয়, বরং স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে নিতে চায়। বাংলাদেশের জনগণ যে আস্থা সবসময় এই বাহিনীর প্রতি রেখেছে, সাম্প্রতিক এই অবস্থান সেই আস্থাকেই আরও শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








