চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Channeliadds-30.01.24Nagod

সেই অ্যামনেস্টির কর্তারাই জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের ‘এক্সপার্ট’!

সম্প্রতি বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মানবাধিকার কাউন্সিলের (এইচআরসি) বিশেষজ্ঞরা পর্যালোচনাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার বারবার তাদের অবস্থান ও তথ্যাদি দেওয়ার পরও কেন এ ধরনের মন্তব্য করেন বিশেষজ্ঞরা সেই প্রশ্ন উত্থাপন করছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই বিশেষজ্ঞদের প্রত্যেকে কোন না কোন সময় অ্যামনেস্টির উচ্চ পর্যায়ে কাজ করেছেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সবসময়ই বিএনপি জামায়াতের পক্ষে বিবৃতি দিতে দেখা গেছে। ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধেও একাধিকবার বিবৃতি দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। সেসময় ট্রাইব্যুনালকেও এই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের কাজের সমালোচনা করতে হয়েছে। আবারও তারা ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করছে।

কারা এই ‘বিশেষজ্ঞ’
উদ্বেগ জানানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তিনজন বিশেষজ্ঞদের কথা উল্লেখ আছে। তারা তিনজনই কোন না কোন সময় অ্যামনেস্টির হয়ে কাজ করেছেন। এরমধ্যে ক্লেমেন্ট নেলেসোসি ভউল, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের টোগো শাখার মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভউল মানবাধিকার রক্ষাকারীদের টোগোলিজ কোয়ালিশন-এর সেক্রেটারি-জেনারেল হিসেবেও কাজ করেছেন। এছাড়াও ২০১১ সালে আফ্রিকান কমিশন অন হিউম্যান অ্যান্ড পিপলস রাইটসের উপদেষ্টা হন তিনি।

Reneta April 2023

আরেক বিশেষজ্ঞ ম্যারি ললোর, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আইরিশ শাখায় তহবিল সংগ্রহকারী হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি এর বোর্ডের সদস্য হন এবং ১৯৮৩ থেকে চার বছর জাতীয় চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৮৮ থেকে ২০০০ পর্যন্ত তিনি সংস্থাটির পরিচালক হিসেবে নেতৃত্ব দেন। পরের বছর, তিনি ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডারস প্রতিষ্ঠা করেন।

এছাড়া আইরিন খান ২০০১ সালে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে খালেদা জিয়া পরিবারের সাথেওযুক্ত।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বরাবরই আওয়ামী বিরোধী
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের আইনি লড়াইয়ের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে বিবৃতি দিয়েছিল।

বিএনপি ও জামায়াত নেতার বিচার ও আপিল প্রক্রিয়ায় ‘গুরুতর ত্রুটি’ রয়েছে দাবি করে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘একাত্তরে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিগুলোও গুরুতর অপরাধ করেছিল। তবে তাদের কারও বিরুদ্ধে তদন্ত হয়নি বা কাউকে বিচারের আওতায় আনা হয়নি।’

গত জুন মাসে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাছান মাহমুদ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর একপেশে অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের জন্য বিবৃতি দেয়। অথচ, ফিলিস্তিনে শিশুরা পাথর ছুড়লে ইসরায়েলি বাহিনী গুলি ছুড়ে পাখি শিকারের মতো শিশুদের হত্যা করে, তাদের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করে না; ২০১৩, ১৪ ও ১৫ সালে বাংলাদেশে মানুষ পোড়ানোর বিরুদ্ধে কিছু বলে না। তাদের এই বিবৃতির কোনো মূল্য নেই।’

তিনি বলেন, ‘আমরা অ্যামনেস্টিকে চিনি। তারেক রহমানের বেয়াইন আইরিন খান অ্যামনেস্টির জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন। এখনও তিনি অ্যামনেস্টির সাথে যুক্ত আছেন। তিনি তারেক রহমানের বউয়ের চাচাতো বোন।’

কী বলছেন বাংলাদেশের বিশ্লেষকরা
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশকে নিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সংস্থাটির বিরুদ্ধ অবস্থান আজকে নতুন নয়।

এখন যেভাবে তারা বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিবৃতি দিয়েছেন, ঠিক তেমনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করতেও একই অবস্থানে ছিল এই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নামক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটি। ২৭ অক্টোবর ২০১৫ সালে দেয়া এক কড়া বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টান্যাশনাল বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচার ও আপিল প্রক্রিয়াকে ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যেসব মুক্তিযোদ্ধা ‘মানবতাবিরোধী’ অপরাধ করেছেন, তাদেরও বিচারের আওতায় আনার দাবি করেছিল। শুধু তাই নয়, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় স্থগিত করতে আহ্বান জানিয়েছিল।

উক্ত বিবৃতির শেষাংশে অ্যামনেস্টি বলেছিল, ১৯৭১ সনে স্বাধীনতাপন্থি বাহিনীও গুরুতর অপরাধ করেছিল। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত কিংবা তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। এই বিবৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা হয়েছিল, যেটি নিঃসন্দেহে ক্ষমা চাওয়ার মতো একটি অপরাধ।

যারা মানবাধিকারের কথা বলছেন তারা কোন উদ্দেশ্য হাসিলের জায়গা থেকে বলছেন জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান (কার্জন) বলেন, যারা মানবাধিকার নিয়ে কথা বলবেন তাদেরকে সব দেশ ও সব মানুষের জন্য একই মান বজায় রেখে কথা বলতে হবে। বিষয়গুলো খুব জটিল। যারা বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে কথা বলছেন তারাই গাজায় ঘটে চলা বর্বরতম ঘটনা চোখে দেখছেন না।

তিনি মনে করেন বৈশ্বিক শক্তির নিজস্ব অনেক স্বার্থ হাসিলের জন্য তারা কখনো মানবাধিকার, কখনো গণতন্ত্র, কখনো শ্রমিক অধিকারের কথা বলে সেই স্বার্থটা হাসিলের পথ খুঁজে বের করে। আমি মনে করি মানবাধিকার গণতন্ত্রের কথা বলতে হলে সব দেশ সব মানুষের জন্য একই মাসের হতে হবে।