গত কয়েক দিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত। যেকোনো মুহূর্তে ইরানে হামলা চালাতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র—এমন গুঞ্জনে ভারী হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গন।
সম্ভাব্য এই হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এরই মধ্যে ওই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, বিমানবাহী রণতরী ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জড়ো করেছে ওয়াশিংটন। চূড়ান্ত নির্দেশের অপেক্ষায় থাকা এই বিশাল সামরিক বহরের পেছনে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে মার্কিন প্রশাসন।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এত টাকা খরচ করে তারা? আর এই যুদ্ধের দামামায় আসলে পকেট ভারী হচ্ছে কাদের?
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ বিমানবাহী রণতরীর বহর, এর সঙ্গে থাকা অন্যান্য আক্রমণাত্মক যুদ্ধজাহাজ, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং হাজার হাজার সৈন্য সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোষাগার থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ খসে যাচ্ছে। কোনো আক্রমণ না চালিয়েও শুধু এই বিশাল সামরিক বহর প্রস্তুত রাখতেই প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি মার্কিন ডলার খরচ হচ্ছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় হিসাব করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৮০ কোটি থেকে ২৪০ কোটি টাকা!
আর যদি পুরোদমে হামলা শুরু হয়, তবে এই খরচের পরিমাণ প্রতিদিন কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। কারণ, তাদের ব্যবহৃত একেকটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডারের দামই কয়েক মিলিয়ন ডলার করে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখনই কোনো বড় যুদ্ধে জড়িয়েছে, খরচের হিসাব আকাশ ছুঁয়েছে। সবশেষ বড় পরিসরে তারা ইরাক ও আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল। ২০০৩ সালে শুরু হওয়া ইরাক যুদ্ধে আমেরিকার সরাসরি সামরিক খরচের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ ট্রিলিয়ন (২ লাখ কোটি) মার্কিন ডলার। যুদ্ধ পরবর্তী সামরিক চিকিৎসাসেবা ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ মিলিয়ে এই অঙ্ক প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। এত বিশাল অঙ্কের অর্থ দিয়ে বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশের কয়েক দশকের বাজেট অনায়াসেই মেটানো সম্ভব।
এত বিশাল খরচের পরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বারবার যুদ্ধের দিকে পা বাড়ায় মূলত তাদের কৌশলগত স্বার্থ ও বিশ্বজুড়ে আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য। মধ্যপ্রাচ্য খনিজ তেল ও জ্বালানি সম্পদে সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল। এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা এবং বিশ্ববাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে নিজস্ব খবরদারি বজায় রাখা আমেরিকার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি, ওই অঞ্চলে নিজেদের সবচেয়ে কাছের মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং শক্তির ভারসাম্য নিজেদের পক্ষে রাখতে তারা ইরানকে সামরিক চাপে রাখতে চায়।
যুদ্ধের এই বিশাল খরচের যোগান আসে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের দেওয়া করের টাকা থেকে। কিন্তু এর আসল সুবিধাভোগী কারা? উত্তরটা লুকিয়ে আছে মার্কিন সমরাস্ত্র শিল্পের ভেতরে। যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনা বাড়লে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় বড় বড় অস্ত্র উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। যুদ্ধবিমান, বোমারু বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও রাডার ব্যবস্থাসহ যাবতীয় সমরাস্ত্র বিক্রি করে এসব প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান রাতারাতি শত শত কোটি ডলার মুনাফা অর্জন করে।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়, যার ফলে লাভবান হয় বহুজাতিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলোও। মূলত এই যুদ্ধভিত্তিক অর্থনীতির চক্রকে সচল রাখতে এবং ক্ষমতাশালী অস্ত্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করতেই এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই দেশটি।








