ভাগ্য কাকে বলা হয়, সেদিন জেনেছি। প্রথম সৌভাগ্য, ভালো বন্ধু পাওয়া। কিভাবে পেলাম, সেও সৌভাগ্যের দান। যদি প্রশ্নের মুখে পড়ি, বন্ধুত্ব কার সাথে কিভাবে হয়? জবাব হুট করে দেয়া যাবে না। আমাদের একটা বন্ধুদলটা তৈরি হয়ে গিয়েছিল, কার সাথে কিভাবে হয়েছিল, তা ভিন্ন ভিন্ন গল্প।
সাগর কচিকাঁচার মেলার আহ্বায়ক ছিল। সেটা কিশোর কিশোরীদের একটা বড়, অত্যন্ত নামি সংগঠন। কচিকাঁচার মেলা ছিল সারা দেশজুড়ে। চাঁদের হাট তখনও সংগঠন হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেনি। আমরা লিখি, আঁকি এমন কয়েকজনকে চাঁদের হাটের পাতায় নানাদিক থেকে এনে জড়ো করছেন দাদুভাই।
আমরা চাঁদের হাটের হয়ে গেছি বা চাঁদের হাট হয়ে গেছে আমাদের। সেই আপন করে নেয়ার অনুভবপ্রাপ্ত হয়ে সে বয়সে আমরা প্রত্যেকে অনেক আনন্দে প্রায়ই সপ্তাহের কয়েকটা দিন মতিঝিল টয়েনবি সার্কুলার রোডের অবজারভার ভবনে গিয়ে মিলিত হই। দাদুভাই আমাদের নিয়ে গল্পে, আলোচনায়, ছড়ায় আসর মাতিয়ে রাখেন। তাতে মনে হয়, পৃথিবী অনেক সুন্দর, জীবন অতি আনন্দময়।
দাদুভাই অর্থাৎ রফিকুল হকের সম্মোহিত করার ক্ষমতা ছিল। ছিল অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং অনায়াসে কথা বলে মুগ্ধ করতে পারতেন। সেইসব কারণে আমরা হয়ে গিয়েছিলাম সেই আকর্ষণীয় মানুষটার ছায়াসঙ্গী, অনুসারী।
তিনি অতি চমৎকার ছড়া লেখেন, মুখে মুখে যখন তখন ছড়া বানাতে পারেন। অত্যন্ত হাসিখুশি মানুষ। তিনি সবাইকে সমানভাবে প্রশ্রয় দেন। আমরা তাঁর কাছে বেশ গুরুত্ব পাই। সে বয়সটায় কারো কাছে গুরুত্ব পাওয়া মানে নিজেদেরকে মনে হতো, সারা দুনিয়ার মালিক। মানুষটার অশেষ মনোযোগ, ভালোবাসা পেয়ে পেয়ে অনুপ্রাণিত হয়েছে আমাদের তারুণ্য।
লেখালেখির সূত্রেই সাগর একদিন চাঁদের হাটে এসে হাজির। দুদিন আগে তার একটা লেখা ছাপা হয়েছে। লেখাটার ইলাস্ট্রেশন করেছি আমি। আমি দেখতে পাই হাস্যোজ্জ্বল এক তরুণ চাঁদের হাটের ছোট অফিস ঘরটায় ঢুকে দাদুভাইয়ের খোঁজ করছে।
রহমান, আবদুর রহমান বরাবরই হাল্কা পাতলা, তালপাতার সেপাই কিন্তু দাদুভাইকে সম্পাদনায় সাহায্য করে বলে বাইরের কেউ এলে ভাব নিয়ে ভারী গলায় কথা বলে। যে তরুন এসেছে, তাকেও ভারী গলাতে বলে, বসো, দাদুভাই এসে যাবেন কিছুক্ষণের মধ্যে।
প্যান্টের উপর সাদা পাঞ্জাবি পরা তরুনটির বুকের বোতাম প্রায় সবগুলো খোলা। লম্বা, চিরুনির যত্ন না পাওয়া চুল। হাসি হাসি মুখের সে তরুণ বসে। বসেই টেবিলের উপর পূর্বদেশ পত্রিকার চলমান সপ্তাহের একটা ফাইল রাখা, সেটা হাতে নেয়। আমি তার বাম দিকে একটু দূরের একটা টেবিলে বসা।
দেশসেরা বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাঠানো লেখা খাম খুলে বের করে দিচ্ছে একজন অফিস সহকারী, আমি সেগুলো পড়ে দেখছি। নতুন একজন এসেছে, মাঝেমাঝে তাকেও দেখছি। বুঝতে পেরেছি, লেখালেখি করে। অনুমান করার চেষ্টা করি, তার লেখা ছাপা হয়েছে, না সাথে করে লেখা এনেছে।
এসে সে দাদুভাইয়ের খোঁজ করেছে বলেই মনে হয়, ছাপানোর জন্য লেখা নিয়ে এসেছে। দেখছি, পূর্বদেশ পত্রিকার পাতা উল্টে চাঁদের হাটের পাতা বের করে তরুণটি রহমান ও মিলনকে একটা লেখা দেখিয়ে বলে, এটা আমার লেখা। মিলন ঝুঁকে লেখাটা দেখে। নামটা বিড়বিড় করে পড়ে, ফরিদুর রেজা সাগর। হাত বাড়িয়ে দেয় মিলন, আমি ইমদাদুল হক মিলন। তোমার লেখা আমি কচিকাঁচার মেলার পাতায় অনেক পড়েছি।
মিলন রহমানকে দেখিয়ে বলে, ছড়াকার আব্দুর রহমান। রহমান হাত বাড়ায় না। চেয়ারে হেলান দিয়ে খুব গম্ভীর ভঙ্গিতে সামনের তরুনকে মনোযোগ দিয় দেখে। অপরিচিত মানুষ হলে রহমানের গলা খবর পাঠকদের মতো হয়ে যায়। তেমন গলায় রহমান বলে, তোমার একটা নামের মধ্যে তিনটি নাম দেখতে পাচ্ছি। ফরিদুর, রেজা এবং সাগর। কোনটা বলে ডাকা হবে?
তরুনটি অতি চটপটে। হাসতে হাসতে বলে ইমদাদুল, হক এবং মিলনও তিনটি নাম মিলে একটা নাম। আবদুর ও রহমানও দুটো মিলে একটা নাম। পুরো নামের শেষে লেজের মতো যেটা ঝুলে থাকে, সেটাই ডাক নাম। আমাকে সাগর বলে ডাকা হয়। তুমি নিশ্চয়ই মিলন? উত্তরের অপেক্ষা না করে রহমানের দিকে তাকায়- আর তুমি হচ্ছো রহমান, ঠিক বলেছি?
দূর থেকে দেখতে পাই, রহমানের গম্ভীর ভঙ্গিমায় আরো একটু গাম্ভীর্য যুক্ত হলো। মিলনের পাশেই তরুনটি বসা। রহমান উল্টোদিকে। মিলন একটু হেসে তরুনকে বলে, বেশ বলতো তুমি। তোমার লেখা পছন্দ করতাম, আজ তোমাকেও ভালো লেগে গেলো। গম্ভীর রহমান রেডিওর সংবাদ পাঠকের মতো গলায় জিজ্ঞাসা করে চা খাবে সাগর?
সাগর মাথা নাড়ে, আমি চা খাই না। সাগর, সে তরুণ বামদিকে ঘুরে আমার দিকে তাকায়। মিলন সেই তাকানো অনুসরণ করে আমাকে লক্ষ্য করে বলে, ওর নাম আফজাল হোসেন কিন্তু সে হোসেন নয়, আমরা তাকে আফজাল বলে ডাকি। শোনামাত্র সাগর চলে আসে আমার সামনে। হাত বাড়িয়ে দেয়, তুমিই আফজাল! আমার লেখায় তোমার আঁকা ইলাস্ট্রেশনটা দারুণ হয়েছে। আমি কম কথা বলা মানুষ। আমার মন অনেক কথা বলতে জানে। মনই বললো, এই ছেলে আমাদের খুব প্রিয় বন্ধু হতে চলেছে।
সাগর আমাদের বন্ধু হয়ে গেলো। দাদুভাই আমাদেরকে বলেন, এই যে তোমরা এখানে এসে জড়ো হও। আড্ডা হয়, লেখালেখি নিয়ে কথা হয়, এটা ভালো কিন্তু আরো ভালো হবে যদি এটাকে সাহিত্য সভায় রূপ দেয়া যায়। যদি সপ্তাহে একদিন সাহিত্য সভার আয়োজন করতে পারো, তোমারা যারা নিয়মিত এখানে আসো, তারা ছাড়াও আরো অনেকে তোমাদের সাথে যুক্ত হতে সুযোগ পেয়ে যাবে। তোমরা যাদের নামের সাথে পরিচিত তাদের সাথে সামনাসামনি দেখা হওয়া অনেক অনেক আনন্দের হবে। সে আনন্দ সবার মনে লেখালেখির তাগিদ বাড়িয়ে দিতে পারে।
সাহিত্য সভায় নিয়মিত সাগর আসতো। প্রায় আসতো হাতে সাদা বেলী ফুল জড়িয়ে। চার পাঁচটা ছোট মালা। নতুন কারো সাথে পরিচিত হলে সাগর হাত থেকে মালা খুলে বাড়িয়ে দিত তার দিকে, নাও তোমার জন্য।
এই যে সদ্য পরিচিত হওয়া কেউ ফুলের মালা পেলো, তাতে এক মূহুর্তেই যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে যায়, সে বন্ধুত্ব থেকে নতুনের অনুভব উবে যায়, এনে দেয় অনেককালের কাছের মানুষের অনুভব।
কেমন কাছের সেটার উদাহরন, সাগর আমাকে ধরে নিয়ে গেলো তার আব্বার কাছে। সেখানে গিয়ে বললো, আমার বন্ধু ভালো শিল্পী, চাঁদের হাটের পাতায় খুব ভালো ইলাস্ট্রেশন করে। প্রচ্ছদও সে খুব ভালো আঁকবে। আম্মার নতুন বইয়ের প্রচ্ছদটা তাকে দিয়ে আঁকানো যাবে কি না!
সৌভাগ্য একেই বলে। বন্ধুত্ব হয়েছে। সে বন্ধুত্ব অতি বিশেষ হয়ে ওঠে যখন জানা হয়, পরস্পর পরস্পরের জন্য কতটা ভাবে, অনুভব করে। তা বুঝতে পারলে, সে অনুভবে বন্ধুত্ব গাঢ় হয়। হয় শোভাময়, বর্ণিল, এবং আনন্দে পূর্ণ। এমন বন্ধুত্ব জীবন গড়ে দেয়। এখন গৌরবের সাথে বলতে পারি, আমার প্রচ্ছদ অংকনশিল্পী পরিচয়ের শুরুর কাজটা দেশের খুবই নামী একজন সাহিত্যিকের উপন্যাসের প্রচ্ছদ এঁকে। তা কিভাবে সম্ভব হয়েছে ভাবতে বসলে মনে হবে অতি সৌভাগ্যবান একজন মানুষ আমি।
সাগরের আব্বা পুত্রের কথা কানে না তুললে রাবেয়া খাতুনের ফেরারী সূর্য উপন্যাসের প্রচ্ছদ এঁকে নতুন জীবনের স্বাদ গ্রহনের সুযোগ মিলতো না। স্বয়ং রাবেয়া খাতুনও ভাবতে পারতেন, আমার গ্রন্থের প্রচ্ছদ কাইয়ূম চৌধুরীর না হয়ে এক অনামা আফজাল হোসেন কেনো আঁকবে?
কাইয়ূম চৌধুরী তখন কোনো বিখ্যাত ছড়াকারের একবই ছড়ার ছবি আঁকা নিয়ে খুবই ব্যস্ত ছিলেন। কি সৌভাগ্য আমার। তিনি যদি অতটা ব্যস্ত না থাকতেন, সাতদিনের মধ্যে প্রচ্ছদটা এঁকে দিতে পারবেন বললে আমার ভাগ্যে ফেরারী সূর্য গ্রন্থের প্রচ্ছদ আঁকার সুযোগ মিলতো না।
মনে সৃজনের বাসনা থাকলে এগিয়ে যাওয়ার তাড়নাও থাকে। মনে ও প্রাণে এ দুটো আছে, চোখের সামনে পথ নেই। দরজা বন্ধ। গল্পের মতো অদৃশ্য থেকে “খুল যা সিম সিম” এমন মন্ত্র উচ্চারণ করলে দরজা সুড়সুড় করে খুলে যাবে না, যায় না। তা কোনো মানুষকে খুলে দিতে হয়। কেউ খুলে দিয়েছিল আর সময় দরজা খোলা পেয়ে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ে বলেছিল, যাও পথে নামো।
আবেগ, বন্ধুত্ব, সুযোগ- জীবনে সবই প্রয়োজন। সব পাওয়ার পর সময়কেও লাগে। যে সময় তৈরি করে মানুষেরা।







