কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সরাসরি সহায়তায় মস্তিষ্কের জটিল অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন যুক্তরাজ্যের চিকিৎসকেরা। অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও স্নায়ুর অবস্থান শনাক্ত করতে লাইভ ভিডিও বিশ্লেষণ করেছে এআই। এর সহায়তায় ঝুঁকিপূর্ণ অংশ এড়িয়ে টিউমার অপসারণ সম্ভব হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর উল্লেখযোগ্যভাবে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছেন ৪৮ বছর বয়সী রাইস হিবার্ট।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, বেডফোর্ডশায়ারের দুই সন্তানের বাবা হিবার্টের মস্তিষ্কে পিটুইটারি গ্রন্থির ওপর ১১ মিলিমিটার আকারের একটি অ-ক্যানসারাস টিউমার শনাক্ত হয়েছিল। টিউমারটি ধীরে ধীরে তার অপটিক নার্ভে চাপ সৃষ্টি করায় পার্শ্বীয় দৃষ্টিশক্তি কমে যাচ্ছিল। পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথা ঘোরা এবং চলাফেরার সময় বিভিন্ন জিনিসে ধাক্কা খাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দেয়।
প্রায় ১৮ মাস আগেও সুস্থ ও কর্মচঞ্চল ছিলেন হিবার্ট। গ্রাহকসেবা ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করতেন তিনি। একদিন দুপুরের খাবারের বিরতিতে হাঁটার সময় হঠাৎ রাস্তায় অচেতন হয়ে পড়ে খিঁচুনি শুরু হয় তার। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মস্তিষ্কে টিউমারটির অস্তিত্ব শনাক্ত করেন চিকিৎসকেরা।
খুলির গোড়ায় পিটুইটারি গ্রন্থির ওপর টিউমারটি অবস্থান করছিল। শরীরের বৃদ্ধি, বিপাকক্রিয়া, রক্তচাপ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বিভিন্ন হরমোন নিঃসরণ করে এই গ্রন্থি। টিউমারের কারণে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার পাশাপাশি হিবার্টের স্বাভাবিক জীবনযাপনও ব্যাহত হচ্ছিল।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন হাসপাতালের সার্জনরা নাক দিয়ে সরু ক্যামেরাযুক্ত একটি এন্ডোস্কোপ প্রবেশ করিয়ে খুলির গোড়ায় পৌঁছান। সেখানে হাড় ও শক্ত ঝিল্লির কয়েকটি স্তরের আড়ালে ছিল টিউমারটি। রোগীভেদে মস্তিষ্কের শারীরিক গঠনে পার্থক্য থাকায় টিউমার অপসারণের নিরাপদ পথ নির্ধারণ ছিল অস্ত্রোপচারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
এই পর্যায়েই চিকিৎসকদের সহায়তা করে এআই প্রযুক্তি। অস্ত্রোপচারের সময় আলাদা একটি পর্দায় লাইভ ভিডিও বিশ্লেষণ করে এআই। অস্ত্রোপচারের যন্ত্রের গতিবিধি অনুসরণ করার পাশাপাশি সম্ভাব্য রক্তনালি ও স্নায়ুর অবস্থান শনাক্ত করে প্রযুক্তিটি। একই সঙ্গে টিউমার অপসারণের তুলনামূলক নিরাপদ অঞ্চলও চিহ্নিত করে।
শত শত পিটুইটারি টিউমার অপসারণের অস্ত্রোপচারের ভিডিও ব্যবহার করে এআই ব্যবস্থাটিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, বিপুলসংখ্যক অস্ত্রোপচারের তথ্যের ওপর প্রশিক্ষিত এই প্রযুক্তি সার্জনের জন্য একজন বিশেষজ্ঞের ‘দ্বিতীয় চোখ’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে অস্ত্রোপচারের নিয়ন্ত্রণ এআইয়ের হাতে ছিল না বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। প্রযুক্তিটি কেবল সার্জনদের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চিকিৎসকেরাই। ভবিষ্যতে অস্ত্রোপচারের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী সার্জনকে বিশেষজ্ঞের মতো পরামর্শ দিতে পারে, এমন এআই ব্যবস্থা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে গবেষকদের।
অস্ত্রোপচারের পর হিবার্টের দৃষ্টিশক্তির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। চোখ খোলার পর আগের তুলনায় অনেক পরিষ্কার দেখতে পান বলে জানান তিনি। অস্ত্রোপচারের আট সপ্তাহ পরও তার দৃষ্টিশক্তির উন্নতি অব্যাহত ছিল। কমেছে অস্ত্রোপচারের আগে থাকা অতিরিক্ত ক্লান্তিসহ অন্যান্য সমস্যাও।
হিবার্ট বলেন, এই অস্ত্রোপচার তাকে তার স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে। ১৮ বছরের দাম্পত্য জীবনে প্রতিদিন সকালে স্ত্রীকে এক কাপ কফি বানিয়ে দেওয়ার অভ্যাস ছিল তার। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে সেই অভ্যাসটিও ধরে রাখতে চান তিনি।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য উদ্ভাবনমন্ত্রী জেমস ফ্রিথ এই সাফল্যকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার মতে, স্বাস্থ্যসেবায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রযুক্তিটির সম্ভাবনাকেও কাজে লাগাতে হবে।
মস্তিষ্কের মতো জটিল অঙ্গের অস্ত্রোপচারে এআইয়ের সরাসরি সহায়তার এই সাফল্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রযুক্তিটির ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে জটিল অস্ত্রোপচারে সার্জনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ‘ডিজিটাল দ্বিতীয় মতামত’ হিসেবে এআই ব্যবহারের পথ আরও প্রসারিত হতে পারে।







