চলচ্চিত্র শিল্পীদের স্বার্থরক্ষা ও সবাইকে এক সুতোয় গাঁথতে প্রয়াত সুপারস্টার নায়করাজ রাজ্জাকের হাত ধরে ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি। আনুষ্ঠানিক কমিটি গঠিত নির্বাচিত হওয়ার আগে আহ্বায়ক ছিলেন খল অভিনেতা আহমেদ শরীফ।
পরে শিল্পীদের ভোটে নায়করাজ রাজ্জাক সভাপতি হয়েছিলেন এবং সাধারণ সম্পাদক হন আহমেদ শরীফ। ওই কমিটিতে আরো ছিলেন প্রয়াত অভিনেতা খলিল, শওকত আকবর, এটিএম শামসুজ্জামানসহ অনেকে।
তখনকার নির্বাচনগুলোতে ছিল না কোনো পক্ষ-বিপক্ষ, প্যানেল কালচার এবং নির্বাচন ঘিরে অপ্রীতিকর ঘটনারও সুযোগ ছিলোনা। এমনকি শিল্পী নির্বাচনে পুলিশ পাহারা দেয়া হতো না! ফলাফল যাই আসতো শিল্পীরা মেনে নিয়ে ভোটের পর আবার একসঙ্গে কাজে নেমে পড়তেন।
বুধবার রাতে শিল্পী সমিতির অফিসে বসে চ্যানেল আই অনলাইনকে এমনটাই বলছিলেন পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে খল অভিনেতা আহমেদ শরীফ। তিনি বলেন, তখন এতো সংগঠন ছিল না। শিল্পীকে কাজ নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকতে হতো। যখন নির্বাচন হতো এফডিসিতে শিল্পী সমাগমে ঈদের আমেজ বিরাজ করতো। উৎসবের আমেজ তারকা শিল্পীরা ভোট দিতে আসতেন।
এখনকার নির্বাচন ও পরবর্তী ঘটনাগুলো লজ্জাজনক উল্লেখ করে আহমেদ শরীফ বলেন, গত কয়েক বছরের শিল্পী সমিতির নির্বাচন ঘিরে এফডিসিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। এমনকি নির্বাচনী ফলাফলের ফয়সালা করতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত যেতে হচ্ছে প্রার্থীদের। এটা সত্যিই দুঃখজনক এবং লজ্জার বিষয়।
আক্ষেপ প্রকাশ করে আহমেদ শরীফ বলেন, শিল্পীরা যদি একটি পরিবার হয় সেই পরিবারে ঝামেলা সৃষ্টি হলে নিজেদের মীমাংসায় ঠিকঠাক করে নেয়া উচিত। তাই বলে আদালতে যেতে হবে কেন? এই নির্বাচন তো এত বড় কোন সিরিয়াস ইস্যু না। বরং এতে প্রকৃত শিল্পীদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। সাধারণ মানুষরা মনে করছে, সিনেমা নয়, শিল্পীদের কাজই মনে হয় এখন নির্বাচন করা।
এদিকে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির গঠনতন্ত্রে উল্লেখ আছে, শিল্পীদের এই সংগঠনটি সম্পূর্ণ অলাভজনক। তাহলে এই নির্বাচন ঘিরে ভোটে অংশ নেয়ার জন্য কিছুকিছু প্রার্থী সমিতির পদ নিয়ে মাতামাতি করছে কেন? বিতর্কিত মন্তব্য করে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে তা আমাদের মত একজন সিনিয়র শিল্পীর জন্য লজ্জাজনক। ব্যক্তিগতভাবে আমি এগুলোতে ভীষণ বিব্রত হই। বলছিলেন প্রবীণ এই অভিনেতা।
আহমেদ শরীফ বলেন, আমি আমেরিকাতে বসবাস করি। সেখানকার মানুষের সাথে দেখা হলে আগে সিনেমার খবর নিতো। বলতো, আপনার অমুক সিনেমা অনেকবার দেখেছি। এখন সিনেমার কথা না জিজ্ঞেস করে এফডিসির নির্বাচন ও গণ্ডগোল নিয়ে জিজ্ঞাসা করে। এতে আমি বিব্রত হই। তাদের বলি, আমি তো এই সংগঠনের নির্বাচন করি না। আবার আমেরিকা প্রবাসীরা আমাকে বলে, আপনাদের সময় তো এমন হতো না। এখন কেন হচ্ছে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে? এসব জানতে চাইলে বিব্রত হই। লজ্জা পেয়ে কোন সঠিক উত্তর দিতে পারি না।
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আহমেদ শরীফ বুধবার রাতে এসেছিলেন সমিতির অফিসে। সেখানে তিনি আসন্ন নির্বাচন ঘিরে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ দেন। আহমেদ শরীফ মনে করেন, সিনেমা নিয়ে সবার আগে আলোচনা হওয়া দরকার। কেন আমরা বিশ্বমানের বেশি বেশি সিনেমা তৈরি করতেন পারছি না, একথা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। নির্বাচন ঘিরে যা হচ্ছে এতে করে সাধারণ মানুষের মনে সিনেমা ও শিল্পীর উপর সাধারণ মানুষের নেগেটিভ ধারণার জন্ম হচ্ছে।
এদিকে, আগামী এপ্রিলের শেষে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা আছে শিল্পী সমিতির ২০২৪-২০২৫ মেয়াদের নির্বাচন। শিল্পী সমিতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে আহমেদ শরীফ বলেন, আমাদের সময় শিল্পী সমিতির নির্বাচন ছিল ঈদের মতো। ঈদের আনন্দের মতো সবাই এখানে ভোটে পছন্দের প্রার্থীদের সমর্থন দিতে আসতেন। কিন্তু এখন যা দেখছি এতে আমার নিজের অনেক কষ্ট লাগে।
আহমেদ শরীফের কথা, শিল্পী সমিতির নির্বাচন নিয়ে এতো কাদা ছোড়াছুড়ি যে পরিচিতদের মুখ থেকে নানা ধরনের কটু কথা শুনতে হয়। নির্বাচনে হার জিত থাকবেই সেটা খুব সুন্দরভাবে মেনে নিয়ে মিলে মিশে কাজ করা উচিত। এটা তো শিল্পীদের সংগঠন। কোন রাজনৈতিক বা পেশি শক্তি প্রদর্শন এই নির্বাচনে কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বিস্মিত হয়ে আহমেদ শরীফ বলেন, শুনেছি নির্বাচনের দিন পুলিশ পাহারা দেয়া হয়। প্রকৃত শিল্পীরাই নির্বাচনে ঢুকতে এফডিসির গেটে পুলিশি জিজ্ঞাবাদ ফেস করে। কেন এটা হবে? যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরার পর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, শিল্পী সমিতির নির্বাচনে নিপুনের প্যানেল থেকে প্রার্থী হতে পারেন আহমেদ শরীফ। এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হয় তার কাছে। তিনি পরিষ্কারভাবে কিছু বললেন না। এজন্য কিছুদিন সময় চাইলেন।
আহমেদ শরীফ বলে, আমেরিকা থেকে আমি কিছু কাজে দেশে এসেছি। কিছুদিন থেকে চলে যাবো। তবে নির্বাচনের আগে অবশ্যই আমি আসবো। শিল্পী সমিতির জন্য যারা কাজ করতে চান তাদের পক্ষেও কাজ করবো। দেখে শুনে আমার ভোট আমি দিবো । কোন প্যানেল থেকে নির্বাচনের অংশ নিব কিনা এর জন্য সিদ্ধান্ত নিতে আমার আরো সময় প্রয়োজন।
গেল কয়েক বছর ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী হয়েছেন। দিন কয়েক আগে দেশে ফিরে শাকিব খানের ‘রাজকুমার’ সিনেমায় একটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এর বাইরে আর তিনি সিনেমা করছেন না।








