বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন সাধারণ থেকে শুরু করে তারকারা মায়েদের নিয়ে আবেগঘন স্মৃতিচারণে ব্যস্ত, ঠিক তার পরদিন নিজের বাবা-মাকে স্মরণ করে হৃদয়ছোঁয়া এক দীর্ঘ পোস্ট শেয়ার করলেন গুণী অভিনেতা, নির্মাতা ও চিত্রশিল্পী আফজাল হোসেন।
ফেসবুকে বাবা-মা ও তিন ভাইবোনের একটি পুরোনো ছবি পোস্ট করে নিজের শৈশব, গ্রামের স্মৃতি, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং মায়ের শেখানো জীবনদর্শনের কথা তুলে ধরেন এই কিংবদন্তী।
আফজাল হোসেন লেখেন, শহরে দীর্ঘদিন কাটালেও তিনি এখনো নিজেকে “পারুলিয়া থেকে আসা ছেলেটি” বলেই মনে করেন। গ্রামের গন্ধ, হ্যারিকেনের কেরোসিনের গন্ধ কিংবা চড়ুই পাখির ডাক এখনো তাকে শৈশবের স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
নিজের স্বভাব নিয়েও খোলামেলা কথা বলেন এই অভিনেতা। জানান, বয়স বাড়লেও সংকোচ, দ্বিধা কিংবা মানুষের প্রতি নরম মনোভাব বদলায়নি। বলেন,“দেখি মুখখানা বদলে গেছে। মুখময় অজস্র অচেনা রেখা, মন রয়ে গেছে সেই পুরানোটাই। এই দীর্ঘ বয়স পর্যন্ত দ্বিধা দ্বন্দ, সংকোচে ভোগা স্বভাবটা সামান্য পাতলা হয়ে যায়নি। আশা আকাঙ্খার রূপেরও বদল হয়নি। কত কিছু দেখে দেখে বয়স বেড়ে গেছে অনেক, এখনো এই মনে চাওয়া পাওয়ার ছটফটানি নেই। প্রয়োজনে কাউকে কিছু বলতে ইচ্ছা হলে বলার আগে ভেবে দেখি, তাকে বিরক্ত করা হবে কি না। এখনো ভুলিনি, জটিল হওয়া ভালো নয়। উপকার বা সহযোগিতা পেলে কৃতজ্ঞ হতে হয়।”
“ভালোর প্রশংসা করতে পারি মন খুলে। সামান্য মিথ্যা বলতে গেলে এখনো বুক কাঁপে। এখনো প্রশংসা শুনলে লজ্জা পাই। আমরা তিন ভাইবোন দেখতে একরকম নই কিন্তু মন একরকমের। নরম। আমরা একসাথে হলে বাচ্চাদের বলি, সময়ের প্রয়োজনে একটু শক্ত হতে হবে। তারাও নরম। সবাই জানি, কারো “আমি কি হনুরে” ভাব দুনিয়াতে কেউই পছন্দ করে না। যোগ্যতা নিয়ে বড়াই করা মানুষদের বোকা বোকা লাগে। তা মনে রাখি। মনে রাখি, আমাদের মতো মানুষদের যোগ্যতার মধ্যে নানা অসম্পূর্ণতা রয়েছে। সে অসম্পূর্ণতা কাটানোর চেষ্টাতেই জীবন মুখর থাকে, রাখে আনন্দ ও উত্তেজনাময়।” লিখেন আফজাল হোসেন।
পোস্টের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল তাঁর মাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ। আফজাল হোসেন জানান, তাঁর মা সবসময় বলতেন-“সুখে থাকার জন্য চেষ্টা করো না, ভালো থাকো, সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করো।”
পাশাপাশি মানুষকে ঠকিয়ে বড় হওয়া যায় না বলেও শিক্ষা দিতেন তিনি। সেই স্মৃতিচারণ করে তিনি লিখেন,“প্রায়ই আপনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, নিঃস্বার্থ থেকো। অপরকে ঠকিয়ে নিজের বিশেষ লাভ হয় না। চারপাশে অনেক ঠকিয়ে বড় হওয়া মানুষ দেখবে, তারা অর্থে বিত্তে বড় হয়েছে কিন্তু নিজের মনের কাছে বড় হয়ে উঠতে পারে না। মানুষ ঠকিয়ে বড় হওয়া মানে, জনমভর নিজের কাছে ছোট হয়ে থাকা।”
শৈশবের একটি স্মৃতি উল্লেখ করে অভিনেতা লেখেন, “আম্মা, ছোটবেলায় কলতলায় ধরে নিয়ে গিয়ে জোর জবরদস্তি করে সাবান মাখিয়ে গোসল করানোর সময় একটু রাগ করেই বলতেন, মানুষ হয়ে বাঁচো। এখন নিয়মিত সাবান মেখে গোসল করি, এতো গোসল, এতো সাবানে “মানুষ হয়ে বাঁচো”কথাটা ধুয়ে যায়নি।”
প্রয়াত বাবা-মাকে স্মরণ করে আবেগঘন এই পোস্টের শেষদিকে তিনি লেখেন, “আপনি নেই, আব্বাও নেই কিন্তু আপনাদের জীবনের সৌন্দর্য, মনের শুভ্রতায় আমরা, সন্তানেরা মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টায় আছি।”
মা দিবসের দিনটিও যে মাকে স্মরণ করেই কেটেছে, সেটিও উল্লেখ করেন এই বরেণ্য শিল্পী। তাঁর ভাষায়, “মা দিবস কেটেছে ক্যামেরার সামনে, আপনাকে মনে করে করে।”
আফজাল হোসেনের এই পোস্ট প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্ত-অনুরাগীরা আবেগাপ্লুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অনেকেই তাঁর লেখাকে জীবনের গভীর উপলব্ধি ও পারিবারিক মূল্যবোধের এক অনন্য প্রকাশ বলে মন্তব্য করেছেন।







