ম্যাচের পাল্লা তখন বাংলাদেশের দিকেই ছিল ঝুঁকে। জয়ের জন্য ৫ বলে দরকার ২ রান। তৃতীয় বলে করিম জানাতের শিকার হন মেহেদী হাসান মিরাজ। পরের দুই বলে তাসকিন আহমেদ ও নাসুম আহমেদকে ফিরিয়ে হ্যাটট্রিক তোলেন জানাত। নাটক তখন জমে ক্ষীর!
কিন্তু পরের বলেই পাল্টে যায় চিত্র। শরিফুল ক্রিজে এসে মেরে দেন চার। টাইগারদের জয়ের বন্দরে পৌঁছাতে ম্যাচ সেরা তাওহিদ হৃদয় ৩২ বলে অপরাজিত থাকেন ৪৭ রানে। ৩ চারের সাথে ২ ছয়ে ইনিংস তার। শরিফুল অপরাজিত থাকেন এক বলে ৪ রানে।
চাপে পড়া দলকে ব্যাট হাতে টেনে তোলেন হৃদয়। শামীম পাটোয়ারির সঙ্গে গড়েন ৭৩ রানের মহামূল্যবান জুটি। বাংলাদেশের নাটকীয় জয়টি আসলে হৃদয়ের ইনিংসের জন্যই হয়েছে সম্ভব।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে ২২ বর্ষী ব্যাটার ছিলেন বেশ চটপটে। সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে সাবলীলভাবে দিয়েছেন উত্তর। শেষ ওভারের নাটকীয়তা নিয়েই প্রথমে বলতে হয় কথা।
‘আমার বিশ্বাস ছিল সবার উপরে। তাসকিন ভাই, নাসুম ভাই, এমনকি শরিফুল, সবাই খুব ভালো ব্যাটিং করে। তাসকিন ভাই ইংল্যান্ডের সঙ্গে এমন একটা ম্যাচে পরপর দুটি চার মারার পর আমরা ম্যাচ জিতে গেছি। শরিফুলের উপর বিশ্বাস আমার ছিল আগে থেকেই। কারণ ওর সম্ভাবনা আমি জানি। আমরা একসঙ্গে অনূর্ধ্ব-১৯ দল থেকে খেলে আসছি এবং সে বড় বড় ছয় মারতে পারে। শরিফুল আসা পর্যন্ত আমার তাই বিশ্বাস ছিল। শরিফুলকে একটা কথাই বলেছিলাম, ‘যদি বল ব্যাটে নাও লাগে তাহলে তুই দৌড় দিস।’ পরে শেষদিকে বলেছি, ‘ম্যাচটি তুই-ই জেতাবি।’
আফগান স্পিন আক্রমণ সামলে ব্যাটিং করে যাওয়া নিয়ে তার ভাষ্য, ‘আমাদের একটা পরিকল্পনা ছিল। বিশ্বের সেরা স্পিন দল ওরা। ওদের সঙ্গে রান করাটা কঠিন। তার পরও আমরা চেষ্টা করেছি, যতটুকু সম্ভব ক্যালকুলেটিভ রিস্ক নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা ভালোভাবে বাস্তবায়ন করতে। আমি মনে করি, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিটি ম্যাচই চ্যালেঞ্জিং থাকে। যেকোনো প্রতিপক্ষের কারও না কারও ভালো দিক থাকেই। আমরা যেভাবে পরিকল্পনা করেছিলাম, তা বাস্তবায়ন করেছি।’
তীরে এসে তরী ডোবার ইতিহাস বাংলাদেশের ক্রিকেটে রয়েছে অনেক। জানাতের হ্যাটট্রিক সেই শঙ্কা আবার জাগালেও হৃদয় ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। দল জয়ের বন্দরে পৌঁছাবে, এ ব্যাপারে ছিলেন আশাবাদী। উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে মনকে রেখেছিলেন শান্ত।
‘আমি স্বাভাবিক ছিলাম। কারণ আমি জানতাম, ২ রান লাগে মাত্র। একটা বলের ব্যাপার। বল ব্যাটে লাগলেই এক-দুই রান হয়ে যাবে। সেই সময়টায় শান্ত থাকার চেষ্টা করেছি। যেহেতু নন স্ট্রাইকে ছিলাম, চেষ্টা করেছি আমার পার্টনারদের যতটুকু তথ্য দেয়া যায় যে বোলার কী বল করতে পারে। এটুকুই।’
অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে শিরোপাজয়ী দলের সদস্য ছিলেন হৃদয়, শরিফুল ও শামীম। এবার জাতীয় দলে একসঙ্গে খেলছেন বিশ্বকাপজয়ী তিন ক্রিকেটার। নিজেদের নিয়ে বিশেষ কিছু বলতে নারাজ ম্যাচসেরা ক্রিকেটার। তার কণ্ঠে ঝরেছে সকলের প্রশংসা।
‘আমরা আজকের ম্যাচটিতে সবাই অবদান রেখেছি। শুধু আমি, শরিফুল, শামীম, আমরা নই। আমরা তিনজন একসঙ্গে বিশ্বকাপ খেলেছি, এজন্যই নয়। শুরু থেকে যদি দেখেন, তাসকিন ভাই, সাকিব ভাই থেকে শুরু করে প্রতিটি বোলার সবাই খুব ভালো শুরু এনে দিয়েছেন। সবার অবদান ছিল। ফিল্ডিংয়ে হোক বা সবদিক থেকে অবদান করেছে।’
‘যদি আমাদের কথা বলেন, আমরা সবসময় চেষ্টা করি দলে অবদান রাখতে এবং প্রতিটি খেলোয়াড় সেটিই করে। আমরা দেশের জন্য খেলছি। সবসময় এটাই মাথায় থাকে যে দেশের জন্য খেলব, দেশকে ভালো ফল এনে দেবো।’
১৫৫ রানের জয়ের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৬৪ রানেই ৪ উইকেট হারায় টিম টাইগার্স। সাকিব আল হাসান সাজঘরে ফেরার পর জেতার সম্ভাবনা হয়েছিল ক্ষীণ। এরপরই টগবগে হৃদয়-শামীমের জুটি ঘুরিয়ে দেয় ম্যাচের মোড়।
মুহূর্তটির বিবরণ দিতে গিয়ে হৃদয় বললেন, ‘আমি শামীমকে একটা কথাই বলেছিলাম, আমরা দুজনেই ব্যাটসম্যান। এরকম ম্যাচ আমরা অনেক জিতিয়েছি। হতে পারে সেটা ঘরোয়াতে। যেহেতু আমরা মিডল অর্ডারে ব্যাট করি, এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি অনেক। ওকে একটা বলেছিলাম যে একটি-দুটি ওভারে মোমেন্টাম আনতে পারলেই খেলাটা ঘুরে যাবে। আমরা সেটিই করতে পেরেছি। মাঝে দুটি ওভারেই মোমেন্টাম বদলে গেছে।’








