বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মহান ত্রয়ী’ নির্মাতাদের মধ্যে ঋত্বিক ঘটক ছিলেন সবচেয়ে কনিষ্ঠ। অন্য দুজন ছিলেন সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেন। ঋত্বিকের জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত, অস্থির এবং আত্মবিধ্বংসী— যেন দুই দিকেই প্রদীপ জ্বালানো! সিনেমার প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও একাগ্রতা ছিল তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসের মতোই গভীর ও উগ্র। এমনকি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধারাও তাঁর অতিরিক্ত বিপ্লবী ধারণাগুলোকে ধারণ করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের চিন্তাধারার পথে একাই চলতে বাধ্য হন।
ঋত্বিক ছিলেন জন্মগত বিপ্লবী- এক “আইকনোক্লাস্ট”। তাই তাঁকে বলা হতো ভারতীয় সিনেমার ‘বিদ্রোহী স্রষ্টা’! তাঁর জীবন ও কাজ- দু’টোই যেমন অস্থির ও তীব্র ছিল, তেমনি তিনি কম বয়সেই, মাত্র পঞ্চাশের কোঠায়, মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জীবন ও অবদান ছিল একেবারে অনন্য; তাঁর কোনো তুলনা ছিল না, প্রতিদ্বন্দ্বীও নয়, এমনকি অনুকারীও পাওয়া যায়নি।
১৯৫৮ সালে ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ চলচ্চিত্র দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু। এর পরের প্রতিটি ছবিই তাঁর আপসহীন মানসিকতা ও সংগ্রামী জীবনের সাক্ষ্য বহন করে। ১৯৬৩ সালে যখন আমি (আদূর গোপালকৃষ্ণন) ভারতের চলচ্চিত্র ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, তখন তিনি সেখানে সহ-প্রধান ও চলচ্চিত্র পরিচালনার অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। তাঁর থিয়েটার ও সিনেমাজীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও কৃতিত্ব আমরা শুনে মুগ্ধ হয়েছিলাম, তাঁর চলচ্চিত্র দেখার ও বক্তৃতা শোনার জন্য অধীর অপেক্ষায় ছিলাম। অবশেষে যখন তা ঘটল, আমরা ছিলাম উত্তেজিত, অনুপ্রাণিত ও বিমোহিত।

ঋত্বিক নিজের চলচ্চিত্র নিয়ে কখনও লজ্জা পেতেন না, বরং খোলামেলাভাবে আলোচনা করতেন। তিনি বোঝাতেন, কেন তিনি ক্যামেরার ঐতিহ্যবাহী “ইম্যাজিনারি লাইন” বা দৃষ্টিকোণ বদলে দিয়েছেন। আমরা তাঁর কাছ থেকে শিখেছিলাম কীভাবে শব্দ কোনো দৃশ্যের আবেগ বাড়াতে ও অর্থের নতুন স্তর যোগ করতে পারে। চলচ্চিত্র নির্মাণে তাঁর তীব্র আবেগ ও আপসহীন দৃষ্টিভঙ্গি- এসবই আমাদের ছাত্রদের কাছে ছিল সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক শিক্ষা।
ঋত্বিক ঘটকের প্রিয় বিদেশি নির্মাতা ছিলেন স্পেন-মেক্সিকোর লুই বুনুয়েল, বিশেষ করে তাঁর নাজারিন(১৯৫৯) চলচ্চিত্র। তবে তিনি ইংমার বার্গম্যানকে পছন্দ করতেন না; ধর্মীয় ভাবধারার কারণে তাঁর প্রতি ঋত্বিক ছিলেন সমালোচনামুখর।
একবার তিনি শ্রেণিকক্ষে সত্যজিৎ রায়ের অপরাজিত চলচ্চিত্র দেখান এবং বলেন, “এটাই মহান সিনেমা।” আমরা সবাই অবাক হয়েছিলাম, কারণ আমরা ভেবেছিলাম রায় ও ঘটক একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু বাস্তবে তারা দুজনেই একে অপরকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন।
আসলে সত্যজিৎ রায়ই তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ঋত্বিককে চলচ্চিত্র ইনস্টিটিউটে নিয়োগ দিতে সুপারিশ করেছিলেন, যা খুব কম লোক জানত। রায় নিজেও ঘটকের প্রশংসা করেছিলেন, তিনি একবার আমাকে (আদূর গোপালকৃষ্ণনকে) বলেছিলেন, ‘ঋত্বিকের শিরায় সিনেমা বইছে।’এমন প্রশংসা রায়ের কাছ থেকে পাওয়া ছোট কথা নয়।
তবু একবার রায় এক দুঃখজনক ঘটনার কথা বলেছিলেন, কলকাতার হাসপাতালে ঘটকের মৃত্যুসংবাদ শুনে তিনি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে যান। বাইরে বেরোতেই কিছু তরুণ চিৎকার করে ওঠে- “তুমি ওকেই মেরেছ!”

ঋত্বিক ঘটকের বৈদিক জ্ঞান, ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে গভীর ধারণা আমাদের মুগ্ধ করেছিল। বাংলা বিভাজন ও তার মানবিক বিপর্যয় তাঁর চলচ্চিত্রের বারবার ফিরে আসা থিম। অনেকেই তাঁকে মদ্যপ হিসেবে জানতেন, কিন্তু তিনি কখনও শ্রেণিকক্ষে মাতাল অবস্থায় আসেননি। বরং তিনি সবসময় হাতে নতুন বই রাখতেন। তাঁর চলচ্চিত্রগুলো ছিল বৈচিত্র্যময়, উদ্ভাবনী ও আবেগে ভরা- যেমন অযান্ত্রিক, মেঘে ঢাকা তারা, সুবর্ণরেখা।
সাধারণ মেলোড্রামাকে শিল্পের উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ছিলো ঋত্বিকের। তাঁর চিত্রায়ণ ছিল প্রচলিত নিয়মের বাইরে। অচেনা ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, লেন্স, আলো, গঠন ও হঠাৎ জাম্পকাট দিয়ে তিনি দৃশ্যের মধ্যে আবেগের তীব্রতা এনে দিতেন।
শব্দ ছিল তাঁর চলচ্চিত্রভাষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দৃশ্যের পরিবেশ বোঝাতে নয়, বরং নাটকীয় প্রভাব সৃষ্টিতে শব্দ ব্যবহার করতেন। তাঁর সাউন্ডট্র্যাক ছিল স্তরবিন্যস্ত, প্রতীকী, কখনও আত্মমগ্ন, যা দৃশ্যের প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিত। অনেক সময় নিজেই তাঁর সিনেমার সংগীত তৈরি করতেন।
তিনি মোট আটটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এর মধ্যে আমার (আদূর গোপালকৃষ্ণন) পছন্দের তিনটি হলো — মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), সুবর্ণরেখা (১৯৬৫) ও অযান্ত্রিক (১৯৫৮)। তাছাড়া হিন্দি সিনেমায় মধুমতি (১৯৫৮)-র গল্প ও চিত্রনাট্য তাঁর লেখা, যা আজও এক ক্লাসিক।

তাঁর প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা ছিল, তবে কখনো শ্রেণিকক্ষের বাইরে তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়তে পারিনি। তাঁর জুনিয়র মনি কাউল ও কুমার সাহানি ছিলেন ঘটকের নিবেদিত শিষ্য। অদ্ভুতভাবে, জীবদ্দশায় ঋত্বিকের কোনো চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রদর্শিত হয়নি, তিনি বিদেশ ভ্রমণও করেননি। তবে তাঁর মৃত্যুর পর বিশ্বজুড়ে একের পর এক রেট্রোস্পেকটিভ অনুষ্ঠিত হয়।
ইনস্টিটিউটে শিক্ষক হিসেবে তাকে পাওয়ার এক দশক পরে দিল্লির এক চলচ্চিত্র উৎসবে ঘটকের সঙ্গে একই মঞ্চে উপস্থিত হিই। এগিয়ে গিয়ে বলি, “স্যার, আমি আপনার ছাত্র ছিলাম ইনস্টিটিউটে। মনে আছে আমাকে?” ঋত্বিক কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মৃদু স্বরে বলেন,“না।”এবং কথোপকথন সেখানেই শেষ হয়!
ঋত্বিকের শতবর্ষে তার ছাত্র এবং ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী নির্মাতা আদুর গোপালকৃষ্ণন এর লেখাটি ছেপেছে দ্য হিন্দু।








