বাংলাদেশে কর কাঠামো এখন অনেক বেশি গতিশীল। সম্পদশালী নাগরিকদের কাছ থেকে রাষ্ট্রের বাড়তি অবদান নিশ্চিত করতে সরকার চালু করেছে সারচার্জ ব্যবস্থা, একধরনের “বাড়তি কর”, যা সম্পদের পরিমাণ বা বিশেষ শর্তের ওপর নির্ভর করে দিতে হয়। সহজভাবে বললে “যার সম্পদ যত বেশি, তার করও তত বেশি।
বাংলাদেশের আয়কর আইন ২০২৩ এবং অর্থ অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী তিন ধরনের সারচার্জ প্রচলিত আছে, সম্পদের উপর সারচার্জ, পরিবেশ সারচার্জ, এবং বিশেষ সারচার্জ। শুধু রাজস্ব বৃদ্ধির উপায় নয়, এটি সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার হাতিয়ার।ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে বেশি অবদান আদায়, পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি, এবং সমাজে সমান সুযোগ সৃষ্টি—এই তিনটি লক্ষ্য পূরণে সারচার্জের ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে।
কেন সারচার্জ গুরুত্বপূর্ণ
সারচার্জের মূল উদ্দেশ্য একেবারে স্পষ্ট, যারা দেশের সম্পদ ও সুযোগের বড় অংশ ভোগ করেন, তারা যেন দেশের উন্নয়নে তুলনামূলকভাবে বেশি অবদান রাখেন। পাশাপাশি, পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রতিবন্ধী অন্তর্ভুক্তি এবং সামাজিক সমতা রক্ষায়ও এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তাই, আপনি যদি উল্লেখযোগ্য সম্পদের মালিক হন, একাধিক গাড়ি ব্যবহার করেন, বা তামাক বা শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যবসা পরিচালনা করেন তাহলে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সারচার্জ সংক্রান্ত নিয়মাবলি যথাযথভাবে অনুসরণ করতে ভুলবেন না। রিটার্নের সঙ্গে সারচার্জ প্রদানের তথ্য ও পরিশোধের কাগজপত্র সংযুক্ত করাও বাধ্যতামূলক। রাষ্ট্রের রাজস্ব ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় সারচার্জ এখন আর শুধু “বাড়তি কর” নয়—এটি এক প্রকার সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতীক।
সম্পদের উপর সারচার্জ
একজন স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাকে আয়করের পাশাপাশি সারচার্জ দিতে হবে যদি, করদাতার নীট সম্পদ (মোট সম্পদ থেকে দায় বাদ দিয়ে যা থাকে) ৪ কোটি টাকার বেশি হয়, অথবা করদাতার নামে একটির বেশি মোটরগাড়ি থাকে, অথবা করদাতার ৮,০০০ বর্গফুটের বেশি আয়তনের ফ্ল্যাট থাকে।
নীট পরিসম্পদের পরিমাণ বলতে আয়কর আইন, ২০২৩ এর ধারা ১৬৭ অনুযায়ী পরিসম্পদ ও দায়ের বিবরণীতে প্রদর্শনযোগ্য নীট পরিসম্পদের পরিমাণ বুঝাবে। এই সারচার্জ হিসাব করা হয় তার করযোগ্য আয়ের ওপর নির্ধারিত করের পরিমাণের উপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ প্রথমে তার আয়কর নির্ধারণ করা হয়, তারপর সেই করের ওপর অর্থ অধ্যাদেশ ২০২৫-এর তফসিল ২ ও ৩ অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে সারচার্জ যোগ করা হয়। ২০২৫-২৬ করবর্ষে ন্যুনতম কর সারচার্জের ভিত্তি হবে কিন্তু ২০২৬-২৭ করবর্ষ হতে ন্যুনতম কর সারচার্জের ভিত্তি হবে না।
সম্পদ সারচার্জের হার
যদি কোনো ব্যক্তির নীট পরিসম্পদের পরিমাণ চার কোটি টাকা পর্যন্ত হয়, তবে তার উপর কোনো সারচার্জ প্রযোজ্য হবে না (০%)। তবে, নীট পরিসম্পদের পরিমাণ যদি চার কোটি টাকার অধিক কিন্তু দশ কোটি টাকার অধিক না হয়, অথবা ওই ব্যক্তির নিজ নামে একের অধিক মোটরগাড়ি থাকে, অথবা তার গৃহ-সম্পত্তির মোট আয়তন ৮,০০০ বর্গফুটের অধিক হয়, তবে তার উপর ১০% সারচার্জ প্রযোজ্য হবে। নীট পরিসম্পদের পরিমাণ যদি দশ কোটি টাকার অধিক কিন্তু বিশ কোটি টাকার অধিক না হয়, তবে তার উপর ২০% সারচার্জ আরোপিত হবে। আবার, নীট পরিসম্পদের পরিমাণ যদি বিশ কোটি টাকার অধিক কিন্তু পঞ্চাশ কোটি টাকার অধিক না হয়, তবে সারচার্জের হার হবে ৩০%। আর নীট পরিসম্পদের পরিমাণ যদি পঞ্চাশ কোটি টাকার অধিক হয়, তবে তার উপর ৩৫% সারচার্জ প্রযোজ্য হবে।
পরিবেশ সারচার্জ
কোনো স্বাভাবিক ব্যক্তির একাধিক মোটর গাড়ি থাকলে তার একের অধিক প্রত্যেকটি গাড়ির জন্য পরিবেশ সারচার্জ প্রদান করতে হয়। মোটর গাড়ি বলতে বাস, মিনিবাস, কোস্টার, প্রাইম মুভার, ট্রাক, লরি, ট্যাংক লরি, পিকআপ ভ্যান, হিউম্যান হলার, অটোরিকশা ও মোটর সাইকেল ব্যতীত অন্যান্য মোটরযান অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে ভালো খবর হলো ২০২৬-২৭ করবর্ষ হতে ইলেকট্রিক গাড়ির (EV) ক্ষেত্রে পরিবেশ সারচার্জ আরোপ করা হবে না।
পরিবেশ সারচার্জের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম
•একাধিক গাড়ির মধ্যে সবচেয়ে কম হারে করযোগ্য গাড়ি বাদে, বাকি প্রতিটি গাড়ির জন্য সারচার্জ দিতে হবে।
•গাড়ির রেজিস্ট্রেশন বা ফিটনেস নবায়নের সময় উৎসে কর কর্তৃপক্ষই সারচার্জ সংগ্রহ করবেন।
•যদি একাধিক বছরের জন্য রেজিস্ট্রেশন হয়, তাহলে পরের বছরগুলোর ৩০ জুনের মধ্যে সারচার্জ দিতে হবে।
•নির্ধারিত সময়ে না দিলে, পুরনো ও নতুন বছরের সারচার্জ একসাথে দিতে হবে।
•এই সারচার্জ ফেরতযোগ্য নয় এবং অন্য কোনো করের সঙ্গে সমন্বয়যোগ্যও নয়।
২০২৫-২০২৬,২০২৬-২০২৭ এবং ২০২৭-২০২৮ করবর্ষের পরিবেশ সারচার্জের হার
যদি কোনো ব্যক্তির মোটরগাড়ি থাকে, তবে তার ইঞ্জিনের ক্ষমতা বা শক্তির ওপর ভিত্তি করে পরিবেশ সারচার্জ আরোপিত হবে। ১৫০০ সিসি বা ৭৫ কিলোওয়াট পর্যন্ত প্রতিটি মোটরগাড়ির জন্য পরিবেশ সারচার্জ হবে ২৫,০০০ টাকা। ১৫০০ সিসি বা ৭৫ কিলোওয়াটের অধিক কিন্তু ২০০০ সিসি বা ১০০ কিলোওয়াটের অধিক নয় এমন প্রতিটি মোটরগাড়ির জন্য সারচার্জ নির্ধারিত হয়েছে ৫০,০০০ টাকা। ২০০০ সিসি বা ১০০ কিলোওয়াটের অধিক কিন্তু ২৫০০ সিসি বা ১২৫ কিলোওয়াটের অধিক নয় এমন প্রতিটি মোটরগাড়ির জন্য সারচার্জ হবে ৭৫,০০০ টাকা। ২৫০০ সিসি বা ১২৫ কিলোওয়াটের অধিক কিন্তু ৩০০০ সিসি বা ১৫০ কিলোওয়াটের অধিক নয় এমন প্রতিটি মোটরগাড়ির জন্য পরিবেশ সারচার্জের হার ১,৫০,০০০ টাকা। ৩০০০ সিসি বা ১৫০ কিলোওয়াটের অধিক কিন্তু ৩৫০০ সিসি বা ১৭৫ কিলোওয়াটের অধিক নয় এমন প্রতিটি মোটরগাড়ির জন্য সারচার্জ হবে ২,০০,০০০ টাকা। আর ৩৫০০ সিসি বা ১৭৫ কিলোওয়াটের অধিক ক্ষমতার প্রতিটি মোটরগাড়ির জন্য পরিবেশ সারচার্জ নির্ধারিত হয়েছে ৩,৫০,০০০ টাকা।
বিশেষ সারচার্জ
সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুলসহ সকল প্রকার তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারক করদাতার উক্ত ব্যবসায় হতে অর্জিত আয়ের উপর ২.৫% হারে সারচার্জ পরিশোধ করতে হবে। কোনো স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণের গম্যতার ক্ষেত্রে দেশে বলবৎ আইনি বিধান অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যবস্থা না রাখলে উক্ত প্রতিষ্ঠানের অর্জিত আয়ের উপর ২.৫% হারে সারচার্জ প্রদেয় হবে।
সবশেষে বলা যায়, সারচার্জ এখন আর কেবল “বাড়তি কর” নয়, বরং এটি একটি লক্ষ্যভিত্তিক রাজস্ব নীতি, যা ধনীদের ন্যায়সংগত অবদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারকে শক্তিশালী করে। তাই যাদের নীট সম্পদ ৪ কোটি টাকার বেশি, একাধিক মোটরগাড়ি রয়েছে, বড় আয়তনের ফ্ল্যাট আছে বা তামাক/শিক্ষা খাতে ব্যবসায়িক আয়ের সংশ্লিষ্টতা আছে, তাদের উচিত রিটার্ন দাখিলের আগে সারচার্জের প্রযোজ্যতা, হার ও পরিশোধ পদ্ধতি ভালোভাবে যাচাই করা এবং যথাযথ দলিলসহ সঠিকভাবে তথ্য উপস্থাপন করা। নিয়ম মেনে সারচার্জ পরিশোধ করলে যেমন আইনগত ঝুঁকি কমে, তেমনি রাষ্ট্রের উন্নয়ন, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং সমাজে সমান সুযোগ তৈরির পথে নাগরিক দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করা হয়।
ফয়সাল ইসলাম, এফসিএ, আর্থিক খাতের বিশ্লেষক








