বৃষ্টিস্নাত আষাঢ়ে প্রাচীন যুগের ভারতীয় মহাকবি কালিদাসই শুধু মন ছুঁয়ে যান না, আধুনিক যুগের বাংলাদেশি বাঙালি কবি আবু হাসান শাহরিয়ারও হয়ে-ওঠেন প্রাসঙ্গিক ও প্রাণস্পর্শী। সরস্বতীর বরপুত্র কালিদাস তাঁর ‘মেঘদুতম্’ কাব্যে যক্ষ ও যক্ষপ্রিয়ার বিরহকাতরতাকে চির-বাঙ্ময় করেছেন। আবু হাসান শাহরিয়ার মাটি-বংশধর; যে-কারণে তাঁর ‘একলব্যের পুনরুত্থান’ কাব্যগ্রন্থে যক্ষ ও যক্ষপ্রিয়া নেই, আছে বৃষ্টিমুখর দিনে মাটিবর্তী প্রেমিক-পুরুষের ইন্দ্রিয়জ আর্তি:
বৃষ্টিমুখরিত প্রেমে মনও আজ শরীরবিচারী
স্তনে কি লাবণ্য ধরে জলে যদি না-ভেজাও শাড়ি!
[দুই খিলি পদ্য]
শাড়ি ভিজিয়ে প্রেয়সীর স্তনের লাবণ্য উপভোগস্পৃহায় কাতর-কবির মানবিক-সঙ্গী যেন বৃষ্টি। আমরা জানি, বৃষ্টি উর্বরতার প্রতীক; বর্ষা ব্যথা-বিরহের ঋতু। এই বৃষ্টি ও বর্ষার সঙ্গে বৃক্ষের সম্বন্ধ চিরকালের। কবি আবু হাসান শাহরিয়ার প্রকৃতির সেই চিরকালীন সম্বন্ধে যুক্ত করেছেন মানবিক সম্পর্ক:
আমার মতোই একলা থাকে এই পৃথিবীর বৃক্ষগুলো—
বৃষ্টি তাদের দুঃখ বোঝে; সেই মুছে দেয় পাতার ধুলো।
[নিরন্তরের ষষ্ঠীপদী]
কবি বৃষ্টিপ্রেমী, কবি বৃক্ষপ্রেমী। কবি নদীস্বভাবী। প্রেমিক কবির অনুপ্রেরণা ও উপলব্ধিতে একমাত্র সত্য হলো প্রকৃতি। বৃষ্টি ও বৃক্ষের পাশাপাশি পাখি ও নদী তাঁর সমগ্র বোধ ও বোধির উৎস। কবি যখন বলেন, ‘পাখিদের ক্যালেন্ডারে রোববার-সোমবার নেই; আজ বৃক্ষবার/ বনে বনে আড্ডাবাজ হাওয়াদের ভিড়/ কাল সারাদিন ছিল বৃষ্টিবার; তারও আগে রৌদ্রবার গেছে/ কতকাল আগে লেখা গতকাল এখনও অস্থির/ পাখিদের ক্যালেন্ডারে বৃক্ষবার, বৃষ্টিবার, রৌদ্রবার থাকে/ মানুষের ক্যালেন্ডারে চিনের প্রাচীর’,[কতকাল আগে লেখা] তখন চিত্রকল্পে বৃক্ষ-বৃষ্টি-রৌদ্রহীন যান্ত্রিক সভ্যতার একটি নিরস-নির্জীব-মরা ছবি ভেসে ওঠে। এ-সূত্রে বৃক্ষপ্রেমী কবি জানিয়ে দেন তাঁর আত্মপরিচয় :
ভাঙো সদর; দেখো আমার অন্দরের মগ্নশ্বাস
আমি কি সেই জাতিস্মর, বংশ যার টোটেমগাছ?
[টোডাকন্যা]
দক্ষিণ ভারতের নীলগিরি পাহাড়গুহার নগণ্য চারণ উপজাতি টোডাদের জীবন-সংস্কৃতির সঙ্গে বৃষ্টি বা বর্ষাগানের যে সম্বন্ধ, পূর্বজন্মে বিশ্বাসী কবি এ-পর্বে সেই আদিম পরিচয়-সূত্র-বৃক্ষকেই করলেন সম্পর্কিত। তাঁর বৃক্ষপ্রেমের চূড়ান্ত কথা :
প্রাণের আদ্যকথা গাছ
প্রাণের প্রান্তকথা গাছ
প্রাণের ঊর্ধ্বকথা গাছ
প্রাণের নিম্নকথা গাছ
প্রাণের মধ্যকথা গাছ
প্রাণের অন্তঃকথা গাছ
মানুষ হয়েও আমি তাই বৃক্ষবিনাশী মানুষের বিপক্ষে কথা বলি
[গাছসূত্র]
মন ও মননের নির্মেদ নির্যাস আবু হাসান শাহরিয়ারের কবিতার ঐশ্বর্য। অনুভূতি আর অভিজ্ঞতাকে রসে ডুবিয়ে টইটুম্বর করা তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। দার্শনিক ভাবলুতায় আক্রান্ত কবির কাছে জীবন প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের হয়ে-ওঠেনি, হয়েছে উপলব্ধির। তাঁর সমকালের সত্তরের দশকের আর-সব কবিরা যখন যূথবদ্ধ স্বদেশভাবনায় সিক্ত, অতিমাত্রায় রাজনীতিমুখর—, আবু হাসান শাহরিয়ার তখন কবিতাকে করেছেন ‘একারসন্ন্যাস’। স্লোগান নয়, স্লোগানধর্মী আকাশমুখী কাব্যলতাও নয়—; তার কবিতায়
লক্ষ্য করা যায় মৃত্তিকার বন্ধন, সময় খুঁড়ে-খুঁড়ে নিজের শিকড় খুঁজে পাওয়ার অমিত-আকাঙ্ক্ষা। শিকড়সন্ধানী ব্রাত্যজন কবির নিঃসঙ্কোচ কাব্যোচ্চারণ :
আমি লুঙ্গি-বাউলের নাতি, শাড়ি-কিষানির ব্যাটা
আমার বাপের নাম কে না জানে— চাষা-মালকোঁচা
আমি গামছা-কুমোরের প্রতিবেশী, জ্ঞাতিগোষ্ঠী নিম্নজনা
ধুতি-গোয়ালারা জ্ঞাতি, আরও জ্ঞাতি খড়ম-তাঁতিরা
আমি লুঙ্গি-বাউলের নাতি, শাড়ি-কিষানির ব্যাটা।
[মাটি-বংশধর]
আত্মপরিচয়ের স্বরূপ প্রকাশে মাটি-বংশধর কবির কণ্ঠে উচ্চারিত হয় তাঁর প্রেয়সীর নাম। তাঁর বউ কাঁচাসোনা তাঁর প্রেয়সী, তাঁর প্রেয়সী-বউ পোশাকি সভ্যতায় আচ্ছাদিত কোনো সংস্কৃত-নারী নয়, সে এক মাটিকন্যা, মাটির মেয়ে, তাঁদের প্রেম রক্ত-মাংসের
মানব-মানবীর পারদর্শী রতিকলা—, আবু হাসান শাহরিয়ারের কবিতায় ফুটে ওঠে এমনই এক অভিনব কাব্যব্যঞ্জনা:
আমার বউয়ের নাম কাঁচাসোনা; তোমাদের মতো বুকে কাঁচুলি পরে না
স্তনে মুখ ঘষে দিয়ে চলে আসি; ঝাঁপিখোলা-ঝাঁপিবন্ধ নেই।
[মাটি-বংশধর]
এমন আরেকটি মানবিক সম্পর্কের মেধাবী রূপকল্প হলো ‘ধূলিবাউল… ধূলিগেরস্থালি…’ কবিতা; যেখানে চরবাউলের মেয়ে ঝাউকন্যা ও কবির পারস্পারিক সম্বন্ধ ধূলিভাই ঝাউবোনের :
আমিও মাটির ছেলে; ধূলিজন্ম মানি
চরবাউলের মেয়ে ঝাউকন্যা আমাকে ডেকেছে— ‘ধূলিভাই’
আমিও জেনেছি তাকে মাটিসহোদরা— ‘ঝাউবোন’
নৌকায় নদীতীরবর্তী জনপদে ঘুরে বেড়ানো এবং বর্ষায় গাছ লাগানো আবু হাসান শাহরিয়ারের নেশা। তাঁর কবিতায় সুরস্রোতা ধনু, মগড়া, কালিন্দী, ভাটেশ্বরী [পাটেশ্বরী], শীতলক্ষ্যা, ফুলেশ্বরী, কর্ণফুলী, ধলেশ্বরী, সোমেশ্বরী, পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র প্রভৃতি নদ-
নদীরা মাতম করে জলের কোরাসে। তাঁর চেতনায়, ‘মানুষের সব গল্প জমা আছে নদীর ভাঁড়ারে।’ [আত্মপ্রতিকৃতি] তাঁর প্রার্থনায়, ‘দুয়ারে উন্মাদ আমি, পাথরের কাছে আজ নদী ভিক্ষা চাই।’ [নদীভিক্ষা] বৃক্ষ তাঁকে যেমন সবুজ হতে শেখায়, তেমনি নদী তাঁকে
অনিঃশেষ মহাজীবনের পথে হাঁটার স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় নগর-অ্যাকুয়ারিয়াম ও নাগরিক শিক্ষা এবং পোশাকি সভ্যতা। কবি আবু হাসান শাহরিয়ার সময়ের অগ্রবর্তী হয়ে দাঁড় করেন সভ্যতা-গণতন্ত্র-অর্থনীতি ইত্যাদি বহুচর্চিত সৌখিন শব্দগুচ্ছের বিপরীত অর্থময়তা :
সভ্যতা একটি বেতোঘোড়া
গণতন্ত্র একটি ঘোড়ারোগ
অর্থনীতি একটি অশ্বডিম্ব
পৃথিবীর পায়ে জুতো থাকলেও তার সুখতলি কবেই ক্ষয়ে গেছে
মানুষ একটি একটি করে পেরেক ঠুকছে দেখো নিজেরই কফিনে
বই হচ্ছে জীবনের অনুবাদ; সরাসরি জীবন পড়ি এসো
মানুষ হচ্ছে কার্বনের কারখানা; প্রতিদিন বায়ুদূষণ করে
অথচ ঘাসও একটি জীবনমুখী প্রযুক্তি; অক্সিজেন দেয়
কেন আমরা শিশুদের ইশকুলে পাঠাই?
কেন বলি, বয়স্কদের অনুসরণ করো??
একবার শিশুদেরই অনুসরণ করলে কেমন হয়???
দেখাই যাক না শিশু কোনটাকে বেছে নেয় আগে—
বই না ফুল
রাস্তা না মাঠ
সেতু না নদী
ছাদ না আকাশ
কম্পিউটার না প্রজাপতি
[প্রতিসভ্যতা]
বস্তুত, তাঁর ‘এ বছর পাখিবন্যা হবে’ কাব্যগ্রন্থের ‘প্রতিসভ্যতা’ কবিতাটির মর্মকথা পাঠোদ্ধারে উপলব্ধিযোগ্য হয়ে-ওঠে নগরভিত্তিক আধুনিক শিক্ষা ও সভ্যতার অসারতা। প্রজাপতির বদলে কম্পিউটার, আকাশের বদলে ছাদ, নদীর বদলে সেতু, মাঠের বদলে রাস্তা, কিংবা ফুলের বদলে বই উপহার দেয়া বহু উচ্চারিত বাহ্য-উন্নয়ন ও আধুনিকতা আদতে যে জড় ও জীবনবিনাশী—, এই চাকচিক্যময় বন্দী অ্যাকুয়ারিয়ামে যে মহাজীবনের বিকাশ নেই—, মুক্তি নেই মানবিক মানুষের—, তা কবি নির্দেশ করেছেন বহুভাবে বহুরূপে ব্যথিত-হৃদয়ে। তাঁর ব্যথা-হতাশা-সংশয় ও চৈতন্যের নিমগ্ন শিল্পরূপ বাঁধা পড়েছে অসংখ্য অক্ষরবৃত্ত বা মিশ্রকলাবৃত্তে। উদাহরণ :
১.
ইঁদুর ফসল খায়; ঘুণপোকা মরাকাঠ কাটে
তাবৎ পৃথিবী খেয়ে মানুষেরা নিদ্রা যায় খাটে
[আরশোলার আদালতে মানুষই সর্বভুক প্রাণী]
২.
রঙিন প্রচ্ছদে-মোড়া গণতন্ত্র বাজারে এসেছে। যত না বচন তাতে, তারও
বেশি বানানবিভ্রাট। যত না বর্ষণ, দেখো, তারও বেশি চিল-চেঁচামেচি।
[ঘাসেরও অভাব, তাই কায়মনে প্রুফ কাটিতেছি]
৩.
মিডিয়ায় পাখি নেই; মশারাই খ্যাতির শিখরে। দুয়ারে ধর্মের ষাঁড়; উলুবনে
চামচিকে ওড়ে।
[মিডিয়ায় পাখি নেই; মশারাই খ্যাতির শিখরে]
৪.
কবিরা রাখাল ছিল এই দেশে; এখন ভিখিরি। ভিক্ষা যার বৃত্তি, তাকে
মহাকাল মনেও রাখে না।
[শহীদ কাদরী]
৫.
কোলাহলই বধিরতা; শ্রুতি খোঁজে জনান্তিক বাঁশি
জলে একা হিজলের ছায়া
[পরিশিষ্ট]
শব্দ গেঁথে গেঁথে নির্জনে গড়তে পারার অপর নাম কবি আবু হাসান শাহরিয়ার। নদীর সাথে কথা বলতে বলতে নিরন্তর পথ হাঁটতে পারার আরেক নাম কবি আবু হাসান শাহরিয়ার। নির্ভার ও নির্মেদ শ্রুতিমধুর কাব্যভাষায় উত্তর-আধুনিকতা অতিক্রম করতে পারা একজন শক্তিমানের নাম কবি আবু হাসান শাহরিয়ার। প্রজ্ঞা, পরিশ্রম, নিষ্ঠা, চিন্তন আর মেধায় তাঁর যে নিজস্ব শব্দসংহতি ও কাব্যবিভূতি, তা বিরুদ্ধপরিবেশে মানবিক বিকাশে মানুষকে পথ দেখাবে। নূতন পথপাড়ি দেয়া মানুষকে হয়তো সেদিন শুনতে হবে না—‘সভ্যতা হাঁটেনি; তুমি এতদূর হেঁটেছ নিছক। পৃথিবীর সব গল্প কমবেশি আদিরসাত্মক।’ সভ্যতার কালিমা মুছে যাক প্রকৃতির শুদ্ধতায়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








