কুয়াশা, আলো-আঁধারি ভেদ করে উঠেছে নতুন সূর্য। শুরু হয়েছে নতুন বছর। নতুন সময়। নতুন মূহুর্ত। পুরাতনকে পেছনে ফেলে নতুনকে গ্রহণ করাই পৃথিবীর চিরায়ত নিয়ম। সেই নিয়মের দিকেই প্রতিনিয়ত হাঁটছে পৃথিবী।
পৃথিবীর প্রতিটি মুহুর্তে কিছু হারিয়ে যায় আর কিছু যোগ হয়। কালের স্রোতে প্রতিমূহুর্ত হারায়, প্রতি সপ্তাহ, প্রতি মাস, প্রতিটা বছর হারায়। হারিয়ে গেলে বেদনায় ভাসি আর যুক্ত হলে আনন্দে মেতে উঠি। ব্যক্তি মানুষের যেমন পাওয়া-না পাওয়া কিংবা হারানোর গল্প থাকে, ঠিক তেমনি ব্যক্তি থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সর্বত্র আমরা কিছু হারাই আর কিছু পাই।
এ কথা চিরন্তন, আমরা যা হারিয়ে ফেলি তা চিরজীবনের তরে হারিয়ে ফেলি। আমরা এক সময় শৈশব-কৈশোরকে হারিয়ে ফেলেছি। প্রতিটি মানুষের জীবনে শৈশব বড় মিষ্টি সময়, বড় অনুভূতির সময়। হারিয়ে ফেলা বিষয় নিয়ে সবসময় আমরা শোকাতুর থাকি। ২০২৫ সালকে আমরা স্মৃতির গহ্বরে ফেলে এসেছি। সেখানে মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা সবকিছুই ছিল। পাওয়া-না পাওয়ার হিসেব ছিল।
এসবের পরিসমাপ্তি ঘটেছে গত ৩১ ডিসেম্বর। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যেমন সবকিছু চুকিয়ে যায়, সব লেনা-দেনা শেষ হয়ে যায়, তেমনি বছরের সবকিছু শেষ হয়ে গেল। হাজার চেষ্টা করেও আর কোনদিন ২০২৫ ফিরে আসবে না, কোনদিন ফিরে আসারও নয়। এ কারণে হয়তো রবি ঠাকুর মন্ত্রে মন্ত্রে উচ্চারণ করেছিলেন—‘‘চুকিয়ে দেব বেচাকেনা, মিটিয়ে দেব গো/মিটিয়ে দেব লেনাদেনা/বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে/তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে/ তারার পানে চেয়ে চেয়ে, নাইবা আমায় ডাকলে।’’
ব্যক্তিগতভাবে আমি অর্জনে যেমন আনন্দিত হই, বিয়োগে তারচেয়ে অধিক শোকাতুর হই। অতীতে আমরা অনেক বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত মানুষ আত্মীয়-স্বজনকে হারিয়ে ফেলেছি। অনেকের সঙ্গে বছরের পর বছর দেখা হয় না। দেখা গেছে, অনেকদিন পর বা অনেক বছর পর দেখা হয় কারো সাথে, তখন কী মনে হয়? মনে হয়, হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে তাকে ভালোবাসি।
সামাজিক জীবনে আমাদের দু:খজনক বিষয় হলো, গত দেড় বছরের বেশি সময় বড় সমস্যা ছিল নিরাপত্তাহীনতা। মব ভায়োলেন্স বা সহিংসতা সৃষ্টি করে পিটিয়ে হত্যা ও হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশজুড়ে ভিন্নমত ও রাজনৈতিক ভিন্ন আদর্শের মানুষ এবং মাজার, দরগা ও বাউলদের ওপর হামলা, নিপীড়নের ঘটনা চোখের সামনে দেখা গেছে। সবশেষ মবের শিকার হলো দেশের দুই শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার। স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও আমরা একে অপরের মতাদর্শকে শ্রদ্ধা করতে শিখিনি। এ দায় অবশ্যই আমাদের। এসব থেকে আমরা নিস্তার চাই।
জাতি হিসেবে, বাংলাদেশি হিসেবে এ বছর আমাদের সবচেয়ে বেদনাময় দিন, দুঃখ ও বিষাদের দিন ৩১ ডিসেম্বর। এই দিনটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে সমাধিস্থ করা হয়। এক শোকাতুর পরিবেশ গ্রাস করেছিল পুরো দেশকে। গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণে কেঁদেছে কোটি প্রাণ। এ দেশের মানুষের হৃদয়ে শ্রদ্ধার যে আসনে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন, তার প্রমাণ মিলেছে বিদায়বেলার সেই অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায়। মানুষ তাদের প্রিয় নেত্রীকে বিদায় জানিয়েছে একরাশ গভীর মমতা আর পরম শ্রদ্ধায়। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে তার সমাধি। এখনো তার সমাধির তীরে ভক্তরা কাঁদছে।
মনে রাখতে হবে, অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে আমাদের বাংলাদেশ। আমরা এমন একটি ভূমির বাসিন্দা, যে দেশের মাটি যে কাউকে আবেগাপ্লুত করবেই। বিমোহিত করে রাখবে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-সুরমাসহ এ দেশের নদ-নদী খাল-বিল। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়-শ্রাবণ এ ভূমির অপার সৌন্দর্যময় দিক।
এই দেশের অবারিত সবুজ প্রান্ত আপনাকে ছুঁয়ে দিবেই। মনসামঙ্গলের কবিগণ এ মাটির আদি কবি। বেহুলা-লখিন্দর-চাঁদ সওদাগর এখানকার আদি চরিত্র। যাত্রাপালা-নাটক-কবিগান এ ভূমির আদি সাংস্কৃতি। পথে ঘাটে নদীর কিনারে সুর তোলার চেয়ে পরম আনন্দ আর কিছু নেই। এ ভূমির পূর্বপুরুগণ ঘাটে ঘাটে তরী ভিড়াতেন। বন্দরে বন্দরে এখনো নোঙর ফেলেন তারা। মাছ ধরার আনন্দ এখানকার মানুষের কাছে অপার্থিব আনন্দ। এ ভূমির ইতিহাস জাগরণের ইতিহাস। এ ভূমির ইতিহাস দ্রোহ-বিদ্রোহের ইতিহাস। এই ভূমির ইতিহাস প্রেম-ভালোবাসারও ইতিহাস।
সৃষ্টির শুরু থেকে পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে চেয়েছেন সবাই। কবি-লেখক, বিজ্ঞানি, দার্শনিক, চিন্তক সবাই পৃথিবীকে নতুন করে সাজাতে চেয়েছেন। নতুন নতুন চিন্তা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন তাঁরা।
নতুন বছরের প্রত্যাশা হলো- এমন একটা দেশ চাই যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপত্তার জন্য ভিনদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতে হবে না। এমন একটা রাজনৈতিক ব্যবস্থা চাই, যেখানে ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে সাথে কোনো বাড়িতে আগুন জ্বলবে না, লুট হবে না কোনো কারখানা। এমন একটা সমাজ চাই, যেখানে বিরোধীপক্ষও মত প্রকাশের স্বাধীনতা পাবে। প্রতিষ্ঠিত হোক একটি মানবিক রাষ্ট্র।
অতীত থেকে আমরা শিখেছি, হেরেছি, কোন কোন জায়গা জয়ও করেছি। নতুনকে গ্রহণ আর পুরাতনকে বিদায়- এটাই পৃথিবীর চিরাচরিত নিয়ম। এটাই নিয়তি। নতুন বছরকে আমরা স্বাগত জানাই। স্বাগতম ২০২৬।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







