খাবার ও পানি ছাড়া ভূমধ্যসাগরে প্রায় ১১ দিন ভেসে থাকার পর গ্রিসগামী একটি নৌকা থেকে অন্তত ১১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে নয়জন বাংলাদেশি বলে জানিয়েছেন বেঁচে যাওয়া এক বাংলাদেশি। তবে মিশরের পুলিশ এখনো সাগরে মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত করতে পারেনি।
রোববার (১৬ আগস্ট) মিশরে চিকিৎসাধীন বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশি আবদুল করিমের বরাতে কায়রোতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (শ্রম) মো. জাকির হোসেনও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দূতাবাসের কর্মকর্তারা স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের আবদুল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
করিমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট ৪২ জন যাত্রী লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন। কিছুদূর যাওয়ার পর নৌকাটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায় এবং জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। এরপর প্রায় ১১ দিন ভূমধ্যসাগরে ভেসে থাকার পর ১৩ আগস্ট মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছান তারা।
জাকির হোসেন জানান, স্থানীয় লোকজন নৌকাটি দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পরে প্রায় ২৯ থেকে ৩০ জনকে উদ্ধার করা হয়। তাদের অনেকেই অচেতন ছিলেন। তাদের দুটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং পুলিশের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছে।
বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলার জন্য দূতাবাস কর্তৃপক্ষ অনুমতি চেয়েছে। সেই সুযোগ পাওয়া গেলে ঘটনাটির বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলে জানান তিনি।
করিমের বরাতে জাকির হোসেন বলেন, খাবার ও পানির অভাব এবং প্রচণ্ড গরমে নৌকায় থাকা ১০ জন মারা যান। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে হয়।
তবে মিশরের পুলিশ দূতাবাসকে জানিয়েছে, ভূমধ্যসাগরে কোনো মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত করার মতো তথ্য তাদের কাছে নেই।
করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, ৪২ যাত্রীর মধ্যে ৩৮ জন বাংলাদেশি এবং চারজন সুদানের নাগরিক ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতেও নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ভিডিওতে করিম বলেন, গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করার পরপরই নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। ফলে তারা আর সামনে এগোতে পারেননি। নৌকায় পর্যাপ্ত খাবার বা পানি ছিল না। তার চোখের সামনে নয় বাংলাদেশি মারা যান। পরে আরও দুজন মারা যান। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে হয়।
দীর্ঘ সময় সাগরে থাকার কারণে বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের শারীরিক অবস্থাও গুরুতরভাবে খারাপ হয়ে যায় বলে জানান করিম। তার ভাষ্য, দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশে ক্ষত ও পচন ধরতে শুরু করে।
করিম আরও জানান, রাবারের নৌকাটিতে সর্বোচ্চ ২৫ জন যাত্রী বহনের সক্ষমতা ছিল। কিন্তু এতে ৪২ জনকে তোলা হয়। নৌকাটিতে ছিল মাত্র একটি ইঞ্জিন।
গ্রিসের পথে বাংলাদেশিরাই বেশি
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্যের বরাতে ব্র্যাকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিসে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ৩ হাজার ৬০৮ বাংলাদেশি এই পথে গ্রিসে পৌঁছেছেন। তালিকায় বাংলাদেশের পর রয়েছে সুদান ও আফগানিস্তান।
এর আগে মার্চেও লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করা একটি নৌকায় অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন সুনামগঞ্জের।
ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ মার্চ লিবিয়ার তব্রুক থেকে নৌকাটি যাত্রা করে। পরে পথ হারিয়ে খাবার ও পানি ছাড়া ছয় দিন সাগরে ভেসে ছিল নৌকাটি। একপর্যায়ে পাচারকারীদের নির্দেশে মরদেহগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।
লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপে যাওয়ার এই পথটি ‘সেন্ট্রাল মেডিটেরিয়ান রুট’ নামে পরিচিত।
ফ্রন্টেক্সের তথ্যের বরাতে ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই পথে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেন ২০ হাজার ২৫৯ বাংলাদেশি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৪ হাজার ২৪৯ জন বাংলাদেশি ইতালিতে এবং ৩ হাজার ৬০৮ জন লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিসে পৌঁছেছেন।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, কয়েক বছর ধরে ইতালির উদ্দেশে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া যাত্রীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বেশি। এখন গ্রিসের উদ্দেশে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যেও বাংলাদেশিরা শীর্ষে।
তার মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। মানবপাচার বন্ধে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার ছাড়া এই পরিস্থিতি বন্ধ করা কঠিন।
সুনামগঞ্জের পাঁচ যুবকের খোঁজ নেই
এদিকে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার অন্তত পাঁচ যুবকের এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
তারা হলেন পাগলা শত্রুমর্দান গ্রামের হৃদয় পাল, চিকরকান্দি গ্রামের এনামুল খান, রিপন মিয়া ও মামুন খান এবং রানসি গ্রামের মো. তালহা।
হৃদয়ের চাচা কানন পাল জানান, গত ৩১ জুলাই সর্বশেষ হৃদয়ের সঙ্গে কথা হয় তার। তখন হৃদয় জানিয়েছিলেন, ৩ আগস্ট গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করবেন তিনি।
কানন বলেন, ওই দিন দুটি নৌকা ছেড়ে যায়। পরে প্রথম নৌকায় থাকা একজন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, হৃদয় দ্বিতীয় নৌকায় ছিলেন। এরপর থেকে তার পরিবারের সদস্যরা আর কোনো খোঁজ পাননি।
আবদুল করিমের পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। যোগাযোগ করা আরও দুটি পরিবারও কথা বলতে রাজি হয়নি।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, প্রভাবশালী দালালরা নিখোঁজ যুবকদের পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করেছেন যে তাদের সন্তানরা বেঁচে আছেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভূমধ্যসাগরে নৌকা বিকল হয়ে দীর্ঘ সময় ভেসে থাকার এ ঘটনায় বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর খবর এখনো মিশরীয় কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। ফলে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ও পরিচয় নিশ্চিত হতে দূতাবাসের পক্ষ থেকে আরও তথ্য সংগ্রহের অপেক্ষা রয়েছে।


