কানাডার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টরন্টো পুলিশ সার্ভিসের সাতজন পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার ও অভিযুক্ত করা হয়েছে। সংগঠিত অপরাধ ও দুর্নীতির অভিযোগে এই অভিযান পরিচালনা করেছে টরন্টো রিজিওনাল পুলিশ।
স্থানীয় গণমাধ্যম সিপি-২৪ এবং সিটিভি নিউজ টরন্টো সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি গোপন তদন্তের অংশ হিসেবেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, অভিযুক্ত সাতজন কর্মকর্তা টরন্টো পুলিশের ১১ ও ১২ ডিভিশনে কর্মরত ছিলেন। এরমধ্যে একজন কর্মকর্তা গ্যাং ও অস্ত্র সংক্রান্ত বিশেষ ইউনিটে কাজ করতেন। অভিযুক্তদের মধ্যে চারজনকে ইতোমধ্যে বেতন ছাড়া সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে
অভিযুক্তদের মধ্যে দুজনের নাম প্রকাশ পেয়েছে। এই ঘটনা টরন্টো পুলিশের ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি করেছে।
টরন্টো পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছে এবং অভিযুক্ত সদস্যদের আইনি সহায়তা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে তারা দাবি করেছে— কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পুরো বাহিনীর সম্মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা উচিত নয়।
কানাডার স্থানীয় সময় আজ সকালে অরোরার ইয়র্ক রিজন পুলিশ সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ‘প্রজেক্ট সাউথ’ অভিযানে মোট ২৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে টরন্টো পুলিশের ৭ জন বর্তমান এবং ১ জন অবসরপ্রাপ্ত অফিসার রয়েছেন। ইয়র্ক পুলিশের ডেপুটি চিফ রায়ান হোগান জানান, এই অফিসাররা অপরাধী চক্রকে পুলিশের গোপন ডাটাবেস থেকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতেন। গ্রেফতারকৃত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে কনস্টেবল টিমোথি বার্নহার্ডসহ আরও অনেকের নাম প্রকাশ করা হয়েছে।
তদন্তকারীদের তথ্যমতে, অভিযুক্ত পুলিশ অফিসাররা মূলত অপরাধী গ্যাং এবং পুলিশের আধুনিক প্রযুক্তির মাঝে একটি ‘সেতুবন্ধন’ হিসেবে কাজ করতেন।
অফিসাররা পুলিশের অত্যন্ত গোপনীয় ডাটাবেস (সিপিআইসি) ব্যবহার করে সাধারণ নাগরিক ও প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাধীদের ঠিকানা এবং ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতেন। এই তথ্যগুলো তারা মোটা অংকের বিনিময়ে টোয়িং মাফিয়া ও গ্যাংস্টারদের হাতে তুলে দিতেন।
এই পাচারকৃত তথ্যের ভিত্তিতেই অপরাধীরা একজন সিনিয়র কারেকশন অফিসারকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। অফিসাররা জানতেন এই তথ্য কোথায় ব্যবহার হবে, তবুও তারা তা সরবরাহ করেছেন।
অভিযুক্তরা কোকেন পাচারের রুট নিরাপদ রাখা এবং লাইসেন্সবিহীন গাঁজার দোকানগুলোকে পুলিশি রেইড থেকে আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে রক্ষা করতেন। বিনিময়ে তারা নিয়মিত মাসোয়ারা বা ঘুষ নিতেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরাধীদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত মাদক বা অস্ত্র পুনরায় কালোবাজারে ছেড়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড এক অনুষ্ঠানে পুলিশের এই গ্রেফতারের ঘটনাকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “আইন রক্ষা করার ব্যাজ পরে যারা অপরাধীদের সাথে হাত মেলায়, তারা সমাজের বড় শত্রু।” তবে তিনি টরন্টো পুলিশ সার্ভিসকে পুরোপুরি দোষারোপ না করে বলেন, গুটিকয়েক ‘খারাপ মানুষের’ জন্য ৮ হাজার সৎ অফিসারের সম্মান নষ্ট হওয়া উচিত নয়। তিনি দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
অন্যদিকে টরন্টোর সিটি হলে এক প্রতিক্রিয়ায় মেয়র অলিভিয়া চাউ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “৭ জন অফিসারের এই কর্মকাণ্ড পুরো পুলিশ বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। যারা অপরাধীদের তথ্য পাচার করে, তাদের জায়গা হওয়া উচিত জেলে।” মেয়র সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, টরন্টো পুলিশে নিয়োগ ও তদারকি ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন না আনলে এমন দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব নয়।
এদিকে টরন্টোতে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।








