লেবাননে ইসরায়েলের এক হামলায় হিজবুল্লাহ-নিয়ন্ত্রিত একটি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিবেদকসহ তিন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। হিজবুল্লাহর মালিকানাধীন টেলিভিশন চ্যানেল আল মানার জানিয়েছে, তাদের সাংবাদিক আলি শুয়াইব একটি গাড়িতে থাকা অবস্থায় ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন।
সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, আলি শুয়াইব একজন ‘সন্ত্রাসী’, যিনি সাংবাদিকতার ছদ্মবেশে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থান প্রকাশ করছিলেন। তবে আল মানার তাদের প্রতিবেদনে শুয়াইবকে ‘প্রতিরোধমাধ্যমের প্রতীক’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) জানিয়েছে, তারা এ হামলার তদন্ত করছে। সংস্থাটি বলেছে, সাংবাদিকরা কোনো অবস্থাতেই বৈধ লক্ষ্যবস্তু নয়, তারা যে প্রতিষ্ঠানের জন্যই কাজ করুক না কেন।
সিপিজে আরও বলেছে, এই যুদ্ধ এবং এর আগের দশকগুলোতে আমরা একটি উদ্বেগজনক ধারা দেখেছি ইসরায়েল সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সক্রিয় যোদ্ধা বা সন্ত্রাসী হওয়ার অভিযোগ তোলে, কিন্তু এর পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দেয় না।
ইরানপন্থী ও হিজবুল্লাহ-সমর্থিত আল মায়াদিন চ্যানেল জানিয়েছে, একই হামলায় ফাতিমা ও মোহাম্মদ ফতৌনি নামে দুই সহোদর সাংবাদিকও নিহত হয়েছেন। লেবাননের প্রেসিডেন্সি এ ঘটনাকে স্পষ্ট অপরাধ বলে আখ্যা দিয়েছে।
প্রেসিডেন্সি এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় বলেছে, ইসরায়েলি আগ্রাসন আবারও আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং যুদ্ধের নিয়মের মৌলিক নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করে, যারা মূলত পেশাগত দায়িত্ব পালনরত বেসামরিক নাগরিক।
ইসরায়েলের বিবৃতিতে নিহত অন্য দুই সাংবাদিকের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
লেবাননের তথ্যমন্ত্রী পল মরকোস জানিয়েছেন, এ ঘটনাকে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার মিশনের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত ও প্রকাশ্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে সরকার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অভিযোগ দাখিল করবে।
তিনি বলেন, আমরা আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো মেনে চলি, যেখানে যুদ্ধকালীন সময়ে সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
দক্ষিণ লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ইসরায়েল সামরিক অভিযান জোরদার করেছে।
আল মায়াদিন প্রকাশিত ভিডিওতে নিহত ফতৌনি ভাইবোনের বাবা বলেন, তিনি সন্তানদের নিয়ে ‘গর্বিত’। তিনি বলেন, একজন বাবা হিসেবে আমি মাথা উঁচু করে দাঁড়াই। চোখে পানি আসে, হৃদয়ে ব্যথা আছে, কিন্তু পথ চলা থামে না। আমরা ভেঙে পড়ি না।
হামলার পর এক সম্প্রচারে আল মায়াদিনের সাংবাদিক জামাল আল-ঘারাবি ঘটনাস্থলে পুড়ে যাওয়া গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, এটাই সেই গাড়ি, একটি বেসামরিক গাড়ি, তিনি দাবি করেন, এতে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
তিনি আরবিতে ‘প্রেস’ লেখা একটি বুলেটপ্রুফ ভেস্ট দেখিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, এই ভেস্ট, এই ভেস্টটাই তো আমার সহকর্মীদের রক্ষা করার কথা ছিল!
আরেকটি ভেস্ট তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি ফাতিমা ফতৌনির। প্রশ্ন রেখে বলেন, ইসরায়েলের আগ্রাসনের সামনে এই ভেস্ট কী করতে পারে? সাংবাদিক ও বেসামরিকদের রক্ষার আন্তর্জাতিক আইন কোথায়?
উল্লেখ্য, দুই বছর আগে অক্টোবর ২০২৪-এ একই ধরনের এক ইসরায়েলি হামলা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন ফাতিমা ফতৌনি। সিপিজে জানিয়েছিল, ওই হামলায় দক্ষিণ লেবাননে সাংবাদিকদের একটি স্থাপনায় আঘাত হানে, যেখানে দুই সাংবাদিক ও এক গণমাধ্যমকর্মী নিহত হন।
সে সময় আল মায়াদিনে প্রকাশিত এক ভিডিওতে ফাতিমা একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তার হেলমেট, প্রেস ভেস্ট ও মাইক্রোফোন দেখিয়ে বলেন, এটাই আমার ভেস্টের অবশিষ্টাংশ, আমার হেলমেট… আর এটাই আমাদের বহন করা অস্ত্র—মাইক্রোফোনটি তুলে ধরে বলেন তিনি।








