১৯৯১ সালের ভয়াল ২৯ এপ্রিল দক্ষিণ চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানা প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে দায়িত্বে অবহেলার কারণে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় বিমান এবং নৌবাহিনী প্রধানকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছিল।
সেই বছরের ৪ জুন বিমান বাহিনীর তৎকালীন প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল মমতাজ উদ্দিন আহমেদ এবং নৌবাহিনীর প্রধান রিয়ার এডমিরাল আমির আহমেদ মুস্তফাসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাব উদ্দিন আহমদ।
ভয়াল ২৯ এপ্রিল দিবাগত মধ্যরাতে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনাসহ দেশের উপকূলীয় এলাকার উপর দিয়ে ১২ থেকে ২০ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে। এতে সরকারি হিসাবে ১ লাখ ৩১ হাজার ৫৩৯ জন মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি নিখোঁজ হন অনেকে। ৭০ হাজার গবাদী পশু মারা যায়। ওই রাতের তাণ্ডবে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে সরকারি হিসাবে বলা হয়।
এরমধ্যে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় থাকা বিমান বাহিনীর অধিকাংশ যুদ্ধবিমান এবং ওই অঞ্চলে থাকা নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজ। দুই বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল শত শত কোটি টাকার।
জানা যায়, ভয়াল ওই দুর্যোগে নৌ এবং বিমানবাহিনীর অনেক যুদ্ধজাহাজ বিকল হয়ে পড়ে। এমনকি রাশিয়া থেকে সদ্য আমদানিকৃত চারটি বাক্স ভর্তি হেলিকপ্টার জলোচ্ছ্বাসের পানিতে ভেসে রাস্তার উপর চলে যায়। হেলিকপ্টারগুলো ৫০০ গজ দূরে তালাবদ্ধ অবস্থায় হ্যাঙ্গারে ছিল। পানি ও বাতাসের চাপে হ্যাঙ্গার ভেঙে গিয়েছিল। নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বিমান বাহিনীরও ক্ষতি প্রচুর ছিল। বিমান বাহিনীর বহু যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
প্রবল শক্তিসম্পন্ন ঘূর্ণিঝড় উপকূলের দিকে এগিয়ে আসার সতর্কবার্তা থাকলেও বিমান এবং নৌবাহিনীর সরঞ্জাম কেন নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়নি সেটি ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দেয়। তদন্তের পর তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি দুই বাহিনীর প্রধানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠান।
সেই ঘূর্ণিঝড়ে বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যু বিশ্বাসীকে হতবাক করে দিয়েছিল। দীর্ঘ এ মৃত্যুর মিছিলের সব থেকে বড় কারণ হিসাবে মনে করা হয় অসচেতনতাকে। নিহতদের অনেক আত্মীয়-স্বজন বলছেন, তারা ঠিকমতো সতর্কবার্তা শোনেননি। আবার অনেকে বলছেন,সতর্কবার্তা শুনলেও তারা সেটিকে যথেষ্ঠ গুরুত্ব দেননি।

সেসময় বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয়েছিল। সতর্ক করা হয়েছিল ‘মহাবিপদ সংকেত’ এর। উপকূলের মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে আসার জন্য বারবার বলা হলেও মানুষ সেটাকে খুব একটা পাত্তা দেয়নি। আবার সাইক্লোন সেল্টার সেন্টার ছিল প্রয়োজনের তুলনায় কম। যে পরিমাণে ছিল, অসচেতনতার কারণে মানুষ যথাসময়ে সেখানে যায়নি। সেজন্য ২০ শতাংশের বেশি মৃত্যু হয়েছে প্রয়োজনীয় আশ্রয়কেন্দ্রের অভাবে। তখনকার একটি আশ্রয়কেন্দ্রে এক হাজারের বেশি মানুষের সংকুলান হতো না। ১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ৪০০, এখন ৫৬৬৫।
এতসবের পর বেঁচে থাকা অনেকের কাছেই ছিল অলৌকিক ঘটনার মতো।
সেই ভয়াল রাতের স্মৃতি মনে পড়লে উপকূলবাসী এখনও আঁতকে ওঠে। প্রলয়ংকরী ঘুর্ণিঝড়ের ৩২ বছর অতিবাহিত হলেও কক্সবাজারসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের উপকূলবাসী এখনও অরক্ষিত। তার সাথে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। এখনও বিভিন্ন স্থানে খোলা রয়েছে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ। ফলে বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় উচ্চ জোয়ারের সময় লোকালয়ে সাগরের লোনাজল এখনও প্রবেশ করছে।








