মো. শফি উল্লাহ রিপন, ফেনী:
ফেনী জেলার নদী, শাখা নদী ও খালের সঙ্গে স্রোতধারা বন্ধ হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় ফেনী শহরের রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে যায়। সামান্য বৃষ্টিতে হাঁটু পানি জমে যায় শহরের প্রতিটি সড়কে। এছাড়াও অবৈধ দখলের কারণে খালগুলো বর্তমানে ড্রেনে পরিণত হয়েছে এবং কিছু কিছু স্থানে ড্রেনের অস্তিত্বও বিলীন হয়ে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, সোনাগাজীর ৫৬টি, দাগনভূঞার ৫২টি, সদর উপজেলার ৩৯টি, পরশুরামের ৪টি, ছাগলনাইয়ার তিনটি ও ফুলগাজী উপজেলার ৯০টি খালই দখল-দূষণে মৃতপ্রায়।
ফেনীর ছয় উপজেলার অন্তত ২৪৪টি খাল ও শাখা নদীর অবৈধ দখল-দূষণের কবলে। বেশিরভাগ খাল বেদখলে, বেহাল অথবা দূষণে ভরাট হয়ে আছে। এতে করে সেগুলো দিয়ে শহরের পানি দ্রুত নামতে পারছে না। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ভারী বর্ষণ ও ভারতীয় উজানের পানিতে সৃষ্ট বন্যায় মানুষজনের পাশাপাশি ক্ষতির শিকার হয় ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, পুকুর-খামার ও গবাদিপশু। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পৌর কর্তৃপক্ষ দফায় দফায় উদ্যোগ নিয়েও খাল ও শাখা নদীগুলোর অবৈধ স্থাপনা নানা জটিলতায় উচ্ছেদ করতে পারেনি, খালও সংস্কার করতে পারেনি।
অন্যদিকে, ফেনীর খাল-বিল আর শাখা নদীগুলো দখল হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পলি মাটি জমে ভরাট হয়ে নাব্যতা হারায় এবং ময়লা-আবর্জনায় জমে কোথাও কোথাও নদী-খাল সংকোচিত হয়ে পড়েছে। এসব খালের পানির প্রবাহ ঠিক করা না গেলে বর্ষা মৌসুমে জলবদ্ধতার আশংকা করছেন স্থানীয়রা। পৌরসভার পক্ষ থেকে খালগুলো পরিস্কারের পদক্ষেপ নিলেও পুনরুদ্ধারে কার্যকরী কোন পদক্ষেপ নেই।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পাগলির ছড়া, পিটিআই ও খাজা আহাম্মদ লেক খালগুলোর মধ্যে কয়েকটি খালের অস্তিত্ব বিলীনের পথে; যেগুলো আছে সেগুলো এখন আর পানি প্রবাহের জায়গা নয় বরং প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেটসহ বিভিন্ন বর্জ্যে ভর্তি, একেকটি ময়লার ভাগাড়ে রূপ নিয়েছে। এসবের কারণে জলাবদ্ধতা, দুর্গন্ধ ও মশার উপদ্রব শহরবাসীর নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।
২০১১ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ফেনী পৌরসভা এলাকার খাজা আহম্মেদ লেক, পাগলির ছড়া খাল, জেল রোডের পিটিআই সংলগ্ন খালের ওপর নির্মাণ করেছে মার্কেট। এতে কোথাও খাল বন্ধ, আবার কোথাও হয়েছে সংকুচিত। যার কুফল ভোগ করতে হচ্ছে পৌর বাসিন্দাদের।
দখল-দূষণে মৃতপ্রায় শহরের দমদমা খাল। এক সময় এ খালেই চলাচল করতো মালবাহী বাণিজ্যিক নৌকা। ছোট-বড় নৌকাগুলো ভিড়ত শহরতলীর দাউদপুল এলাকায়। সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নানা পণ্যের সমারোহে বসতো মাসব্যাপী রাসমেলা। ফেনী শহরের দোকান মালিকদের মালামাল আনা-নেয়া ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম ভরসা ছিল এ খাল।
দাগনভূঞা উপজেলার রাজাপুর বাজারসংলগ্ন ‘দত্তের খালটি দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এবং আশপাশের ময়লা-আবর্জনা ফেলায় ও দখল-দূষণের কারণে বর্তমানে এটি অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। দাগনভূঞার ‘দাদনা খাল” ১৯ কিলোমিটার বিস্তৃত। এই খালটি স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের পেটে চলে গেছে। দাদনা খালের প্রশস্ততা ৬৫ ফুট হলেও এখন ১০ ফুট বা কোথাও ১৫ ফুট টিকে আছে। সোনাগাজীর ডাঙ্গি খাল এখন নালায় পরিণত হয়েছে। খালের চারপাশে ও উপরে বিভিন্ন সময় প্রভাবশালীরা স্থাপনা নির্মাণ করে দখল করায় পানিপ্রবাহ কমে গেছে।
ফেনী শহরের বাসিন্দা শরীফুল ইসলাম রাসেল জানান, শহরের দাউদপুর খাল ও পাগলিছড়া খালের পাশে প্রতিনিয়ত ময়লা-আবর্জনা ফেলে খাল দখল করা হয়েছে। আড়তের ময়লায় শুধু খালের পানি দূষণই হচ্ছে না, সেই সঙ্গে বন্ধ হচ্ছে পানির প্রবাহ। শহরের অন্য খালগুলোর দশাও প্রায় এক। পানিপ্রবাহের গতিরোধ হওয়ায় এতে সামান্য বৃষ্টিতে একাডেমি এলাকার নিম্নাঞ্চল ডুবে যায়।
প্রবীণ সাংবাদিক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের জানান, খাল দখলের এ প্রক্রিয়া এক-দু’দিনের নয়। ৩০-৪০ বছর ধারাবাহিকভাবে খালগুলো একটু একটু করে দখল হচ্ছে। অনেক খাল কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে বিলীন। এসব খাল ও পানির প্রবাহ ধ্বংস করার করুণ পরিণতি এবারের বন্যায় মানুষ দেখেছে। বন্যা দীর্ঘায়িত হওয়ার বড় কারণ পানির প্রবাহগুলো নষ্ট হওয়া।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আক্তার হোসেন মজুমদার বলেন, খাল ও নদীর ৭১৯ কিলোমিটার অংশের মধ্যে বিগত পাঁচ বছরে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হয়েছে। বন্যায় জলবদ্ধতা ও মানুষের দুর্ভোগ কমাতে বরাদ্দ পেলে ফেনীর নদ-নদী ও খালগুলো খনন ও সংস্কার করে পানির গতির প্রবাহ স্বাভাবিক করা হবে।
শহরের খালগুলো দীর্ঘদিন খনন বা সংস্কার না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব এলাকার খাল সংস্কার করবে স্ব-স্ব কর্তৃপক্ষ।
ফেনী পৌর প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, খালগুলো দূষণ থেকে রক্ষার বিষয়ে পৌরসভার পক্ষ থেকে ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আগামী বর্ষায় জলবদ্ধতা থেকে রেহাই পাবে পৌরবাসী।
খালগুলো অবৈধ দখলের কারণে অস্তিত্বহীন হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খালগুলো পুনরুদ্ধারে নানা জটিলতার কারণে সম্ভব হচ্ছে না। তবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থার পর ক্রমান্বয়ে অবৈধ দখল থেকে খালগুলো উদ্ধারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।








