কানাডায় চাকরির প্রলোভনে ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ
ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে প্রতারণা, চক্রের নারী সদস্য গ্রেপ্তার

কানাডার একটি কোম্পানিতে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন। বিদেশ যেতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও তৈরি করে দেওয়ার আশ্বাস। এভাবে এক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ধাপে ধাপে নেওয়া হয় ২০ লাখ ১০ হাজার ৭০০ টাকা। পরে কানাডা দূতাবাসে যোগাযোগ করে জানা যায়, হাতে তুলে দেওয়া কাগজপত্রগুলোই ভুয়া।
এ ঘটনায় বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণার অভিযোগে একটি চক্রের নারী সদস্য নার্গিস বেওয়া ওরফে সালমা আক্তারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির দাবি, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে তার প্রকৃত পরিচয় ও অবস্থান শনাক্তের পর নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিআইডি জানায়, ২৬ বছর বয়সী নার্গিস বেওয়া ওরফে সালমা আক্তারের বাড়ি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ থানার নয়ানখাল উত্তরপাড়ায়। ২৬ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত ২টা ১৫ মিনিটে ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, কানাডার একটি কোম্পানিতে চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ভুক্তভোগীর সঙ্গে মোট ৩০ লাখ টাকার মৌখিক চুক্তি করেন অভিযুক্ত নারী। এরপর ২০২৫ সালের ২৮ মে থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তার কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, বিকাশের মাধ্যমে নেওয়া হয় ১৭ লাখ ৮১ হাজার ৮৯০ টাকা। এছাড়া নগদ ও রকেটের মাধ্যমে নেওয়া হয় আরও ২ লাখ ২৮ হাজার ৮১০ টাকা। সব মিলিয়ে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে আত্মসাৎ করা হয় ২০ লাখ ১০ হাজার ৭০০ টাকা।
টাকা নেওয়ার পর কানাডায় যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে ভুক্তভোগীর কাছে দেওয়া হয়। এসব কাগজপত্র নিয়ে কানাডা দূতাবাসে যোগাযোগ করলে যাচাইয়ের পর সেগুলো ভুয়া বলে জানানো হয়। এরপর প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন ভুক্তভোগী।
ঘটনার পর ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর কাফরুল থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী। মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৫০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ জানায়, মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে বিদেশে লোক পাঠানোর নামে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। চক্রের সদস্যরা পরস্পর যোগসাজশে ভুয়া ও জাল কাগজপত্র তৈরি করে সেগুলো আসল হিসেবে ব্যবহার করে অর্থ আদায় করতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
সিআইডির ভাষ্য, গ্রেপ্তার নার্গিস বেওয়া নিজের প্রকৃত নাম-ঠিকানা গোপন রেখে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন। মামলার নথি বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তার প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
গ্রেপ্তারের সময় জব্দ করা মোবাইল ফোনটি মামলার আলামত হিসেবে রাখা হয়েছে। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, ফোনে থাকা যোগাযোগ, লেনদেন বা অন্যান্য তথ্য থেকে চক্রটির কার্যক্রম সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
সিআইডি জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার নারী তার সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছেন। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
তদন্ত এখন শুধু একজন নারীকে গ্রেপ্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণার এই ঘটনায় আরও কারা জড়িত, ভুক্তভোগীর কাছ থেকে নেওয়া অর্থের পুরো পরিমাণ কত এবং সেই টাকা কোথায় কোথায় গেছে এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে সিআইডি।
একই সঙ্গে ভুয়া কাগজপত্র তৈরিতে কারা যুক্ত ছিল এবং সেগুলো তৈরির পর কীভাবে ভুক্তভোগীর কাছে পৌঁছানো হয়েছে, তাও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
সিআইডি জানিয়েছে, মামলায় এজাহারভুক্ত আসামিদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তির ভূমিকা শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তদন্তে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
বিদেশে চাকরি ও অভিবাসনের সুযোগ করে দেওয়ার নামে বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। তবে এই মামলায় ভুক্তভোগীর কাছ থেকে নেওয়া অর্থের পাশাপাশি ভুয়া নথি সরবরাহের অভিযোগও এসেছে। ফলে প্রতারণার পুরো চক্র এবং অর্থের লেনদেনের পথ শনাক্ত করাকেই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখছে সিআইডি।







