জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক যে দু’জন ছাত্রের দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং তাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের যে বিক্ষোভ ও আন্দোলন; তাতে নানা মহলের নানা গুণী আলোচনা-সমালোচনা শুনে বিষয়টা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সংঘটিত একটি দুর্ঘটনা কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয় এমন নজির বাংলাদেশের অন্তত বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক আন্দোলনগুলোর ইতিহাসে খুব বেশি নজির নেই।
দীর্ঘ সময়কাল ধরে নিজে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং বর্তমানে খণ্ডকালীন শিক্ষক হবার সুবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি সম্পর্কে কিছু ধারণা আছে। প্রশাসনের সমস্যা, নৈরাজ্য, দুর্বলতা, বর্ধিত ফি, শিক্ষার্থী বিরোধী ইত্যাদি সিদ্ধান্তে ছাত্র-শিক্ষকরা নানা প্রতিবাদ করে থাকেন। মাঝে মাঝে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ পার হয়ে বিশাল আন্দোলনের রূপ নেয়-নিতেই পারে।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই সব আন্দোলনে অনেক ধরনের উৎসাহী চক্র ঢুকে যায়। তারা শিক্ষার্থীদের নানা বিষয়ে উত্তেজিত করে প্রশাসনের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনে যুক্ত কর্মকর্তা শিক্ষকরা দ্বৈত ভূমিকা পালন করে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেন, যেখানে তাদের সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য সাধিত হয়। ছাত্রদের কোন উন্নয়ন বা লাভ হতে দেখা যায় না।
কেন্দ্রীয়, স্থানীয় বা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক স্বার্থ হাসিলের রাজনীতিতে শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে দুর্ভোগ ও কষ্টের শিকার হয়ে থাকে। কিন্তু সরল মনা, তারুণ্যের উত্তেজনায় পূর্ণ সাধারণ শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাজনীতির এই মারপ্যাঁচ বুঝতে না পারে কোন কোন ক্ষেত্রে সত্যিকার প্রগতিশীল প্রশাসনের বিপক্ষে গিয়ে সুবিধাবাদী প্রশাসনের পথ সুগম করে দেয়।
একটি স্থিতিশীল যোগ্য প্রশাসনকে উৎখাত করার জন্য প্রতিক্রিয়াশীল চক্র নানা পথ খুঁজতে থাকে। আর বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্থিতিকে অস্থির করার জন্য সবচেয়ে কার্যকর নিয়ামক পন্থা- শিক্ষার্থীদের সহিংস আন্দোলন। যেকোনো ভাবে একটি আন্দোলন দাঁড় করিয়ে দিতে পারলে সেটা এক সময় সাইক্লোনের মত আঘাত হানবে এবং বিবাদমান নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে ষড়যন্ত্রকারী চক্রের মূল উদ্দেশ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়।
এক্ষেত্রে আন্দোলনের কারণ, গুরুত্ব, প্রভাব বা বিকাশ যতই ক্ষুদ্র বা অবিবেচক হোক না কেন প্রথম উৎসাহে একে সহিংস করে তোলাই প্রতিক্রিয়াশীলদের কাজ। শিক্ষার্থীরা সহিংস হলে তারা প্রশাসনের কোন কথা শুনতে চাইবে না, মানতে বা বিশ্বাস করতে চাইবে না। পূর্ববর্তী ক্ষোভসহ তারা বিভিন্ন দাবি দাওয়া আরো মারমুখী ও আন্দোলনমুখী হয়ে উঠবেন। নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য ভাঙচুর, প্রতিপক্ষের প্রতি আক্রমণাত্মক হবেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন (দুষ্টু হোক আর ভালো হোক) পুলিশসহ নানা রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রয়োগ ঘটাবেন। ফলে, যেকোনো ভাবে প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য। এবং চরম অবস্থার পরিণতিতে হয়তো উপাচার্যের পতন, না হলে কঠিন হস্তে মামলা, নিপীড়ন, কারাগারে পাঠিয়ে শিক্ষার্থীদের উত্তেজনা দমন করা হয়। যেকোনো আন্দোলনের পরেই উপাচার্য থাকুন বা না থাকুন তার প্রশাসনিক কাঠামোতে অবিশ্বাস তৈরি ও দুর্বল হয়ে যায়। তিনি বেশিদিন আর দায়িত্ব পালন করতে পারেন না।
ফলে, একটি চক্র সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে তাদের চরম উদ্দেশ্য সাধন করতে সামর্থ্য হয়। মজার বিষয় হলো সাধারণ রাজনীতি বা ছাত্র রাজনীতিএ মত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের রাজনীতি পরিচালিত হয় না। তাদেরটা হয় অনেকটা মাফিয়া রাজনীতির মতো প্রকাশ্যে কোন শত্রু থাকে না। আরো গভীরে নাই বা গেলাম।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য ডঃ ফারজানা ইসলাম সম্পর্কে আমি শুধু জানতাম তিনি আমাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন উনার শিক্ষকতা জীবনের শুরুতে। তিনি ভালো মানুষ বা মন্দ মানুষ সেই বিবেচনার চেয়ে প্রধান যে বিষয়টি আসে, তিনি একজন শিক্ষক। তিনি নিজ যোগ্যতায় উপাচার্য হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। নারী প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী নেত্রী বা সংসদের স্পীকার থাকা সত্ত্বেও নারী’র সার্বজনীন ক্ষমতায়ন বা মূল্যায়ন আমাদের সমাজে এখনও অনেক দুর্বল। সেক্ষেত্রে একটি প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে তার নিয়োগ অবশ্যই একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
পত্রপত্রিকা বা টকশো এর মাধ্যমে জানা গেল, তিনি দায়িত্ব নেবার তিন বছর তিন মাসের মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে বড় কোন সমস্যা বা অপ্রীতিকর ঘটনার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়নি। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ ছিল স্বাভাবিক এবং শিক্ষাবান্ধব। লক্ষ্য করার মতো বিষয়, ক্যাম্পাসে একটি অসাম্প্রদায়িক এবং সুস্থ সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ বজায় রাখতে উপাচার্য মহোদয়ের নির্দেশে চৈত্র সংক্রান্তি, নবীন-বরণ, পহেলা বৈশাখসহ নানা জাতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ দিবসে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়ে আসছে।
এবছর ২৬ শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী নাট্যউৎসবে মুক্তিযোদ্ধাসহ সারাদেশের ৫৪ জন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য ব্যক্তিত্বকে গুণী সম্মাননা দেয়া হয়; যা অন্যান্য যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ডে বিরল। বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ ঘিরে জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসকে উপাচার্য তার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে নানা আয়োজনে মুখর করে রাখেন। শিক্ষার্থী বা যে কোনো বিভাগের শিক্ষাগত ও মানবিক উন্নয়নমূলক আয়োজনকে তিনি উৎসাহিত করেছেন। এসব কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
আমাদের মনে রাখা দরকার, দেশব্যাপী যেখানে ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তির উত্থান ও বিকাশ ঘটেই চলেছে। তারা সরাসরি আক্রমণ করছে আমাদের সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধে সেখানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক সুস্থ পরিবেশ থাকবে, এটা প্রতিক্রিয়াশীল মেনে নেবে না বোঝায় যায়। সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তির স্বর্ণযুগ ও দাপটের কালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হিসেবে আমাদের অবস্থান ছিল।
তাদের প্রকৃতি, গতিবিধি ও পরিকল্পনা সম্পর্কে তৎকালীন আমাদের যে অভিজ্ঞতা- বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক ও অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ তারা কোনোভাবে সহ্য বা মেনে নিতে পারেন না। ১৯৯৮ সাল থেকে তাই বিশাল সময় ধরে আমরা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষ থেকে নাট্য উৎসব, চলচ্চিত্র উৎসব সহ নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আয়োজন করে তাদের দীর্ঘ ১২-১৩ বছরের নিয়ন্ত্রিত বন্ধ্যা পরিবেশ সরিয়ে নতুন মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করি।
এটা ছিল একপ্রকার সাংস্কৃতিক সংগ্রাম তাদের বিরুদ্ধে। তারাও জানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সুস্থ চিন্তার বিকাশ, বাঙালি সংস্কৃতির সার্বজনীন চর্চা অব্যাহত থাকলে তাদের সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধতার বিষ নিঃশ্বাস ছড়ানো সম্ভব হবে না। তাই তারা প্রগতিশীল প্রশাসনকে যেকোনো চেষ্টায় সরিয়ে দিতে চাইবে আর সেই চেষ্টাই অব্যাহত আছে বলে আমি মনে করি। সারাদেশের প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাংস্কৃতিক চর্চা খুব বেশি হয় না। সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও মহান একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য বলা হলেও বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তা পালিত হয় না, হলেও দায়সারা কিছু অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।
এমন কি হামলা, হয়রানি ও হুঁশিয়ারি দিয়ে অনেক স্থানে অনুষ্ঠান করতে দেয় না। কিছুদিন পূর্বে সিলেটের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শনসহ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল চক্রান্তকারীদের রুখে দিতে জনগণ সম্পৃক্ত জাতীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বহুমুখি চর্চার বিকল্প নাই।
দুর্ঘটনা বিষয়ে কয়েকটা কথা না বললেই নয়। শিক্ষার্থীর কাছে তার একজন বন্ধু নিহত হওয়া চরম কষ্ট ও আবেগের ব্যাপার। ছাত্র অবস্থায় আমাদের সহপাঠী হারানোর বেদনার শোক সইবার মতো অবস্থা থাকে না। সবকিছু তখন ভেঙ্গে-চুরে বন্ধুকে ফিরিয়ে আনতে ইচ্ছে করে। ফলে, অবরোধ করে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক বন্ধ করেছে শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে তারা ভুল বা ঠিক বিচারে না যাওয়া ভালো। কিন্তু এই ধরনের পরিস্থিতিতে ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠনগুলো পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ভূমিকা রাখে যাতে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রেক্ষাপট থেকে বের হয়ে না যায়। কারণ শিক্ষার্থীরা তখন নিজেদের দাবি-দাওয়া আদায় প্রসঙ্গে প্রশাসনের চেয়ে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে অধিক বিশ্বাস করে থাকে।
ফলে, সকলের কাছে সংগঠন নেতৃবৃন্দের দায়িত্বশীল আচরেণর প্রত্যাশা থাকে বেশি । প্রশাসনের দিক থেকে যেমন তাদের প্রতি প্রত্যাশা থাকে, তেমনি শিক্ষার্থীদের দিক থেকে প্রত্যাশা থাকে আরও বেশি। কিন্তু এক্ষেত্রে তাদের কি ভূমিকা ছিল বোঝা যায় না। ছাত্রলীগকে দায়ী করা হল প্রশাসনের সাথে থাকার অভিযোগে। কিন্তু গত ৩০ মে, ২০১৭ রাতে একাত্তর টিভি চ্যানেলে ছাত্র ইউনিয়নের ‘জয়’ নামক যে ছাত্রনেতাকে ডাকা হল, তার অবস্থা দেখে মনে হল তিনি ঘটনার সূত্রপাত বা ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানেন না।
বামপন্থীদের স্বভাবসুলভ তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার দিকে গিয়ে তিনি একটি আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছেন। সঞ্চালকের প্রশ্নের উত্তরে উপাচার্য মহোদয় ব্যাখ্যা করলেন, নিহত ছাত্রদের পরিবারের সিদ্ধান্তে তারা হাসপাতাল থেকে লাশ গ্রামে নিয়ে যায়। তিনি তার প্রমাণ হিসেবে নিহতের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিলেন। এটা খুব স্বাভাবিক, ভোর পাঁচটায় যে ছাত্রটি নিহত হয়েছে, পরিবার নিশ্চয় তার লাশ দুপুর বিকেল পর্যন্ত মাঠে রেখে ছাত্রছাত্রীদের দাবি-দাওয়া মেটানোর জন্য বসে থাকবে না। তার উপর সেদিন ছিল প্রচণ্ড গরম।
ছাত্রদের দু’জনই তবলীগের অনুসারী। হাসপাতালে একবার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে বার বার জানাজা পড়ানো মাজহাব জনিত কারণে সমস্যা হয়। বন্ধু বা সহপাঠীরা অনেক ক্ষেত্রে আবেগ বা উত্তেজনার বশে এই বিষয়গুলো উপেক্ষা করে থাকেন, কিন্তু বাস্তবতা অন্যরকম। এসব আনুষ্ঠানিকতা বা আবেগের চেয়ে পরিবারের তখন নিজের সন্তান বা মানুষটিকে কিভাবে গ্রামে গিয়ে সুন্দর করে দাফন করবে সেই চিন্তাটাই প্রধান থাকে।
এই অবস্থায়, জানাজা পড়ানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঢুকতে না দেয়ার অভিযোগ খুব বেশি ধোপে টেকে না। দ্বিতীয় যে কারণটি দেখানো হল, উপাচার্য মহোদয় শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেয়ার পর কেন তিনি পুলিশ দিয়ে আক্রমণ করলেন। ছাত্র ইউনিয়ন নেতা জয় জানালেন, উপাচার্য কোন দাবিতে সই করেন নি। অথচ তিনি স্পষ্ট করে বললেন, তিনি রাস্তায় গিয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ শিক্ষার্থীদের দাবিতে তাৎক্ষনিক ভাবে সই করেন এবং সেটার কপি তিনি দেখান টিভি-তে। ইউটিউব বা অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমেও দেখা যায় তিনি ছাত্রদের সাথে তখন মহাসড়কে ছিলেন।
তিনি আরও জানালেন, স্থানীয় প্রশাসনের লোক টিএনও, পুলিশ সুপার থেকে সবাই তাকে শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক থেকে সরে যাবার নির্দেশনা দিতে জানায়। এক্ষেত্রে তারা উপাচার্যের কোন অনুমতির তোয়াক্কা করবে না বলেও জানান। কারণ যেখানে শিক্ষার্থীরা অবরোধ করে রেখেছে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকা নয়, সাধারণ জনগণের প্রধান সড়ক । ৫-৬ ঘণ্টা একটি ব্যস্ততম মহাসড়ক অবরোধ করে রাখার মতো ভিত্তি এই আন্দোলনের থাকতে পারে না । কারণ সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ বা কারো দ্বারা এই দুর্ঘটনা হয় নি।
এমনকি দাবিতে যে স্পীড ব্রেকার প্রতিস্থাপনের কথা বলে হয়েছে, তার জন্য উপাচার্যের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে স্বরাষ্ট্র ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলা হয়েছে। উপাচার্য শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক থেকে সরে যাবার কথা জানালেও শিক্ষার্থীরা কি সরে গিয়ে ছিল?
পুলিশ সুপারের নির্দেশে পুলিশ আক্রমণ করেছে এটা বোঝাই যায়। কারণ সড়ক এলাকায় পুলিশকে নির্দেশ দেয়ার সুযোগ তো উপাচার্যের থাকার কথা না। এই বিষয়ে রাজনৈতিক কর্মী ‘জয়’ তথ্য বিভ্রান্তিতে পরে গেলেন। তিনি ’৫২’র ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের মতো এই আন্দোলনেও সড়ক অবরোধ করে এবং জনগণকে জিম্মি করে রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে বলে অপ্রাসঙ্গিক কিছু যুক্তি দেয়ার চেষ্টা করেন।
তিনি যদি এই আন্দোলনের একজন নেতৃস্থানীয় হয়ে থাকেন, তাহলে তার বক্তব্য আরও বস্তুনিষ্ঠ ও যুক্তিসম্মত হওয়া দরকার ছিল। ফলে বোঝা যায়, আন্দোলনের গুরুত্ব ও যথার্থতা বিষয়ে সাধারণ ছাত্র বা তাদের নেতাদের কোন যৌক্তিক অবস্থান নেই। সাধারণ শিক্ষার্থী বিষয়ে সংবাদপত্রে বা, নিউজ পোর্টালে কিংবা ফেসবুক স্ট্যাটাসে যা দেখা যায়, তারা ক্ষুব্ধ, ব্যথিত এবং আশাহত। তাদের অভিযোগ উপাচার্য মহোদয়ের প্রতি, হয়তো তাদের প্রত্যাশা উনার কাছে একটু বেশি ছিল বা আছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলতে উপাচার্য একা কোনো প্রতিষ্ঠান বোঝায় না। ফলে, উনার উপদেষ্টা, অন্যান্য সহকর্মী, শিক্ষকবৃন্দ- সবার মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
উপাচার্যের কোন পদক্ষেপে যদি কারো প্রশ্ন থাকে তাহলে তাকে সরাসরি বলা যেতে পারে। কিন্তু তার বাসায় যখন আক্রমণ হয়, তালা খোলার চেষ্টা হয়, তখন উপস্থিত শিক্ষকদের সাথে আলোচনায় না বসে ভাংচুর শুরু করার কারণ কি ?
একটি বিষয় যোগ করতে চাই। উপাচার্যের বাসায় যেটুকু হামলা হয়েছে, তা অনেকে যথেষ্ট মনে করেন না। আমি অবাক হই, একটি বাসায় ঢোকার সময় পাথর দিয়ে বাড়ি মেরে মেরে গেটের তালা ভাঙ্গছি আর পেছনে শত শত ছাত্র। এর চেয়ে ভয়ানক আতঙ্কের মুহূর্ত কি হতে পারে ? একজন সুস্থ ব্যক্তিও এধরণের পরিস্থিতিতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যেতে পারেন, ডায়েবেটিস বা প্রেশার উঠে চরম অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন। শুনেছি মাননীয় উপাচার্য পরিবার নিয়ে থাকেন। তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের তখন কেমন আতঙ্ক বোধ হচ্ছিল ?
এ ধরণের মব আক্রমণ সাম্প্রদায়িক বা বর্ণবাদী দাঙ্গার সময় দেখা যায়। ফটোগ্রাফ বা ভিডিও ফুটেজে আমরা কি ছাত্রদের খুব শান্ত অবস্থায় দেখেছি ? হয়তো উপাচার্য মহোদয়া অসুস্থ বা মারা গেলে ছাত্র জয়ী ভাবতো নিজেদের, কিন্তু পরিবারের অন্য সদসদ্যের কারো যদি কিছু হতো কে নিতো এই দায় ভার ?
আরও ধিক্কারজনক হলো তাৎক্ষণিক ছাত্র হয়ে শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলা। তাদের পাথর ছুঁড়ে মারা, গালি দেওয়া এমনকি গাছের কাঁঠাল ছিঁড়ে শিক্ষকদের গায়ে মারা হয়েছে। অনেক শিক্ষক আহতও হয়েছেন। এটা কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রজীবনের ৬-৭ বছর কালে নিজের বিভাগ বা অন্য বিভাগ – কোন শিক্ষক বলতে পারবে না – মারামারি তো দূরে থাক, অন্তত বেয়াদবি করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবাদ থেমে থাকেনি আন্দোলন হয়েছে, তর্ক হয়েছে, যুক্তি বিনিময় হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা রাগ করে চলে গিয়েছেন কথা রাখছিনা বলে।
দু’হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়েছি শিক্ষকদের কথা রাখতে পারছি না বলে। কিন্তু শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলা এটা সামাজিক, ধার্মিক বা নৈতিক – যে কোনো বিচারে অপরাধ। অনেকে বলবেন – এখন সময় পালটেছে, শিক্ষকরা হয়তো অনেকে শিক্ষার্থীদের সম্মান ধরে রাখতে পারছেন না। কিন্তু শিক্ষক যতই দোষ করুক, বকা দিক – তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হবে আন্দোলন হবে কিন্তু গায়ে হাত তোলা মেনে নেয়া যায় না। অবস্থা, পরিস্থিতিতে নির্বিশেষে প্রাইমারী স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পর্যন্ত এমনকি একদিনের জন্য যিনি শিক্ষক তার ক্ষেত্রেও কোন দুর্ব্যবহার শিক্ষার্থীদের করা উচিত নয়। এটা জাতিগত ভাবে আমাদের চরম অপমান।
পরিশেষে, উপাচার্য মহোদয় ডঃ ফারজানা ইসলামকে বলি, আপনি শান্ত ও স্থির থাকুন। শিক্ষার্থীরা এখনো আপনাকে মাতৃতুল্য ভালোবাসে। আপনিও তাদের যথেষ্ট সম্মান ও ভালবাসেন – ৭১ চ্যানেলে আপনার বক্তব্য থেকে বুঝেছি আমরা। এই আন্দোলনে শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের দোষী মনে না করে বরং কে বা কারা শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত হয়ে পেছনে ইন্ধন জুগিয়েছে তাদের খুঁজে বের করুন। যে সমস্ত শিক্ষার্থী আটক হয়েছে বা পুলিশ হেফাজতে আছে তাদের প্রতি সদয় হোন।
পুলিশের রাবার বুলেট বা আঘাতে যারা আহত হয়েছে, তাদের চিকিৎসার খবর নিন। তারা বুঝে বা না বুঝে যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা থেকে তারা নিজেদের শুধরে নিয়ে পড়াশুনায় মনোযোগ দিতে পারে সে ব্যবস্থা করুন। আপনি আবারো আগের মতো, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে একটু সুন্দর অসাম্প্রদায়িক, সাংস্কৃতিক শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যাবেন- এই আমাদের প্রত্যাশা।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







