মহান ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদদের স্মৃতিকে ধারণ করে আগামী বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) শুরু হতে যাচ্ছে বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে বইমেলা ২০২৬। উদ্বোধনের প্রাক্কালে মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ২টায় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এবারের মেলার সার্বিক প্রস্তুতি, বিন্যাস, নিরাপত্তা ও নতুন উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির সচিব ও বইমেলার সদস্য-সচিব ড. মো. সেলিম রেজা, জনসংযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ বিভাগের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) জি এম মিজানুর রহমান, মেলা ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক ড. সরকার আমিন, মেলার ব্যবস্থাপনা সহযোগী বর্তমান বাংলা লিমিটেড–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম এবং কমিউনিকেশন ম্যানেজার ইয়াছিন শরীফ।
বইমেলার এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ও উদ্বোধন
এবারের বইমেলার মূল প্রতিপাদ্য “বহুমাত্রিক বাংলাদেশ”। আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুর ২টায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমপি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ প্রদান করবেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে বই এবং বইমেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—এই প্রত্যাশা থেকেই এবারের আয়োজনকে আরও সমৃদ্ধ ও সুসংগঠিত করা হয়েছে।
অংশগ্রহণ ও স্টলসংক্রান্ত তথ্য
এবারের বইমেলায় অংশ নিচ্ছে মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রতিষ্ঠান। মোট ইউনিট সংখ্যা ১০১৮টি। গত বছর অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ছিল ৭০৮টি এবং ইউনিট ছিল ১০৮৪টি।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চসংলগ্ন গাছতলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বর স্থাপন করা হয়েছে বলেও এসময় জানানো হয়। সেখানে ৮৭টি লিটল ম্যাগাজিনকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শিশুচত্বরে থাকছে ৬৩টি প্রতিষ্ঠান ও ১০৭টি ইউনিট।
স্টল বিন্যাস ও প্রবেশপথে পরিবর্তন
গতবারের বিন্যাস অক্ষুণ্ণ রেখে কিছু আঙ্গিকগত পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে। মেট্রোরেল স্টেশনের অবস্থানের কারণে বাহিরপথ মন্দির গেটের কাছাকাছি স্থানান্তর করা হয়েছে। টিএসসি, দোয়েল চত্বর, এমআরটি বেসিং প্লান্ট এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশন অংশে মোট চারটি প্রবেশ ও বাহিরপথ থাকবে।
খাবারের স্টলগুলো ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনের সীমানা ঘেঁষে সুবিন্যস্তভাবে সাজানো হয়েছে। নামাজের স্থান, ওয়াশরুমসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা অব্যাহত থাকবে। পবিত্র রমজান উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে মুসল্লিদের জন্য সুরা তারাবি নামাজের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
শিশুচত্বর মেলার মাঝামাঝি স্থানে রাখা হয়েছে, যাতে শিশুরা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে বই সংগ্রহ করতে পারে।
বিক্রয়, অনুষ্ঠান ও শিশুপ্রহর
মেলায় বাংলা একাডেমি ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের নির্ধারিত কমিশনে বই বিক্রয় করবে। বাংলা একাডেমির বই ও পত্রপত্রিকা বিক্রির জন্য মেলার দুই অংশেই স্টল থাকবে।
প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত মূল মঞ্চে বিষয়ভিত্তিক সেমিনার এবং বিকেল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। প্রতি শুক্র ও শনিবার সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত থাকবে ‘শিশুপ্রহর’। শিশুকিশোরদের জন্য চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকবে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
মেলায় নিরাপত্তা ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ
মেলার প্রবেশ ও বাহিরপথে পর্যাপ্ত আর্চওয়ে স্থাপন করা হয়েছে বলে জানান কর্তৃপক্ষ। সার্বিক নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাব, আনসার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। পুরো এলাকাজুড়ে স্থাপন করা হয়েছে পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা।
মেলাপ্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকবে। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ধূলি নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো এবং মশক নিধনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে।
এবারের বইমেলাকে ‘জিরো ওয়েস্ট বইমেলা’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত মেলার পাশাপাশি স্টল, ব্যানার, লিফলেট ও খাবারের দোকানসহ সব ক্ষেত্রে পাট, কাপড়, কাগজের মতো পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
পুরস্কার ঘোষণা
অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার প্রদান করা হবে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগত মান বিচারে সেরা প্রকাশককে দেওয়া হবে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’। শৈল্পিক বিচারে সেরা বই প্রকাশের জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠান পাবে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’। শিশুতোষ গ্রন্থে গুণগত মানের জন্য দেওয়া হবে ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার’। স্টলের নান্দনিক সাজসজ্জার জন্য থাকবে ‘কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’।
এবার প্রথমবারের মতো প্রবর্তন করা হয়েছে ‘সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার’। নতুন অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গুণগত মানে সর্বাধিক সংখ্যক বই প্রকাশের ভিত্তিতে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান নির্ধারণ করে এ পুরস্কার দেওয়া হবে।
মেলার সময়সূচি
২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত বইমেলা চলবে। কর্মদিবসে বেলা ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এবং ছুটির দিনে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে। রাত ৮টা ৩০ মিনিটের পর নতুন করে প্রবেশ করা যাবে না।








