হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে বাহরাইনের নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি খসড়া প্রস্তাবে ১১২টি দেশ সহ-উদ্যোক্তা হিসেবে সমর্থন জানিয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আল জাজিরা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক উদ্বেগই এতে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
বাহরাইন ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্থাপিত এ প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক জলপথ, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহ সুরক্ষার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। এছাড়া উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলা বন্ধের আহ্বানও রয়েছে প্রস্তাবে।
কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েত বাহরাইন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে যুক্ত হয়েছে। এছাড়া ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, কেনিয়া, আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্রও এতে সমর্থন দিয়েছে।
নিউইয়র্ক থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি গ্যাব্রিয়েল এলিজন্দো বলেন, সহ-উদ্যোক্তা দেশের তালিকাই তিন পৃষ্ঠা জুড়ে। মূলত জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এ প্রস্তাবের সঙ্গে রয়েছে।
এর আগে গত মাসেও বাহরাইন একই ধরনের একটি প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে তোলে। তবে তখন চীন ও রাশিয়া সেটিতে ভেটো দেয়। নতুন খসড়া নিয়েও দুই দেশ আপত্তি জানিয়েছে, যদিও ভোটাভুটিতে গেলে তারা আবার ভেটো দেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এখন পর্যন্ত প্রস্তাবটির ওপর ভোটের কোনো তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।
এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনা এখনো অচলাবস্থায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি গুটিয়ে নেওয়া এবং হরমুজ প্রণালিতে আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে ইরান যুদ্ধক্ষতিপূরণ, নিজেদের বন্দর ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির দাবি তুলেছে। লেবাননে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরাইল ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
তেহরান আরও বলেছে, যেকোনো সমঝোতায় হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি দিতে হবে। তবে ওয়াশিংটন এ দাবিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদী মঙ্গলবার (১২ মে) অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র শান্তির বদলে আত্মসমর্পণ চাপিয়ে দিতে চায়। সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, অপমান, হুমকি ও জোরপূর্বক ছাড় আদায়ের ভাষায় প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তার দাবি, ইরানের প্রস্তাবগুলো কোনো ‘সর্বোচ্চ দাবি’ নয়, বরং একটি টেকসই ও কার্যকর সমঝোতার জন্য ‘ন্যূনতম শর্ত’।
এদিকে আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতাও বেড়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মঙ্গলবার দোহায় কাতারি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালিকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার প্রভাব এখন বিশ্বের সব দেশই অনুভব করছে। একইসঙ্গে জলপথটি পুনরায় উন্মুক্ত করার জন্য সমঝোতার আহ্বান জানান তিনি।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান বিন জসিম আল থানি যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ফেরার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, আমরা যুদ্ধ পুনরায় শুরু হোক, তা সমর্থন করি না। পাকিস্তান যে ভূমিকা পালন করছে, তা পুরো অঞ্চল ও বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে ইরান ইস্যুতে আলোচনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাষ্ট্রীয় সফরে বেইজিং পৌঁছেছেন। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং–এর সঙ্গে বৈঠকে ইরান যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীন তেহরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। তবে এখন পর্যন্ত বেইজিং সরাসরি সংঘাতে জড়ায়নি, যদিও ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
ট্রাম্পের তিন দিনের চীন সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন দীর্ঘস্থায়ী ইরান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এতে তার জনপ্রিয়তাও কমেছে।
তবে বেইজিং যাওয়ার আগে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ অবসানের আলোচনায় মার্কিন জনগণের অর্থনৈতিক সংকট তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে না।
তিনি বলেন, আমি আমেরিকানদের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে ভাবি না। আমি কারও কথাই ভাবি না। আমি শুধু একটি বিষয় ভাবি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দেওয়া যাবে না। এটাই একমাত্র বিষয়, যা আমাকে উদ্বুদ্ধ করে।







