প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের অদ্ভুত এক প্রাণী হচ্ছে ‘সান্ডা’। যা সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত হচ্ছে। মরুর দেশের প্রাণী সান্ডা। এটি এক ধরনের গিরগিটি জাতীয় সরীসৃপ।
দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার মরুভূমি অঞ্চলে এদের বেশি দেখা যায়। কাঁটাযুক্ত লেজওয়ালা এই লিজার্ডটি নিয়ে নানা ভুল ধারণা থাকলেও বাস্তবে এটি পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চলুন জেনে নেওয়া যাক ‘সান্ডা’ সম্পর্কে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
জানা গেছে, আরবের ধনীরা মূলত সান্ডা খেতে অনেক পছন্দ করেন। এ জন্য আরব ধনীদের অধীনে কাজ করা শ্রমিক বা সেবকরা মরুভূমিতে গিয়ে সান্ডা খুঁজে আনেন।
১. নামের উৎস
‘সান্ডা’ নামটি মূলত ভারত ও পাকিস্তানের স্থানীয় ভাষা থেকে এসেছে। আবার অনেক জায়গায় এটিকে “সান্দা” বা “সান্দু গিরগিটি” নামেও ডাকা হয়। বিজ্ঞানীরা কিছু মরু অঞ্চলে সান্ডার আদিম প্রজাতির ফসিল (অবশেষ) আবিষ্কার করেছেন, যা থেকে বোঝা যায়, এ প্রাণী কোটি বছরের বেশি সময় ধরে পৃথিবীতে রয়েছে।
২. আত্মরক্ষার অভিনব কৌশল
সান্ডার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর কাঁটাযুক্ত শক্ত লেজ। শত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে এটি লেজ দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত করে আত্মরক্ষা করে। সান্ডা বিপদের সময় নিজেকে গর্তে প্রবেশ করিয়ে লেজ দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেয়। এতে শিকারি বা শত্রু ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না।

৩. দৃষ্টিশক্তি তীক্ষ্ণ
সান্ডার চোখ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। দূর থেকে শত্রু বা খাবার শনাক্ত করতে সক্ষম। সান্ডা মূলত নিরামিষভোজী। তারা গাছের পাতা, ফুল ও ফল খায়। শুকনো অঞ্চলে তারা ক্যাকটাস ও অন্যান্য মরু উদ্ভিদ খেয়েও বেঁচে থাকে।
৪. ঠান্ডা থেকে নিজেকে রক্ষার কৌশল
রাতে মরু অঞ্চলের তাপমাত্রা অনেক কমে যায়। তখন সান্ডা মাটির অনেক গভীরে লুকিয়ে থাকে, যাতে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। অন্যান্য সরীসৃপের মতো সান্ডাও শীতল রক্তবিশিষ্ট প্রাণী। সূর্যের তাপে শরীর গরম করে এরা সক্রিয় হয়।
৫. সূর্যস্নান ছাড়া বাঁচে না
সান্ডা সক্রিয় হওয়ার জন্য সকালবেলা সূর্যস্নান করে। সূর্যের তাপ না পেলে এরা চলাফেরা বা খাওয়াদাওয়াও করতে পারে না। যদিও সাধারণত একা থাকে, তবে কিছু কিছু প্রজাতি দিনে একত্রে সূর্যস্নান করে। একে সামাজিক আচরণ হিসেবে দেখা হয়।
৬. আচরণগত বৈশিষ্ট্য
সান্ডা সাধারণত একাকী জীবনযাপন করে। তবে প্রজননের মৌসুমে পুরুষ ও নারী সান্ডা একত্র হয়। মেয়ে সান্ডা বছরে একবার ডিম পাড়ে। প্রতিবারে ১০-৪০টি ডিম দিতে পারে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে প্রায় ৬-৮ সপ্তাহ সময় লাগে।

৭. তাপমাত্রার সঙ্গে রঙের পরিবর্তন
সান্ডার গায়ের রঙ তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে হালকা বা গাঢ় হতে পারে, যা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
৮. আয়ু
প্রাকৃতিক পরিবেশে সান্ডা ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। তবে বন্দি অবস্থায় সঠিক যত্নে এর আয়ু আরও বাড়তে পারে।
৯. ভুল ধারণা ও শিকার
অনেক এলাকায় বিশ্বাস করা হয় সান্ডার তেল বা দেহাংশে ওষুধি গুণ রয়েছে, যা একেবারেই বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন। এর ফলে সান্ডা ব্যাপক হারে শিকার করা হয়। ভুয়া ওষুধি গুণের প্রচারণার কারণে সান্ডার দাম আন্তর্জাতিক কালোবাজারে অনেক বেশি, যার ফলে এ প্রাণীটি পাচারকারীদের অন্যতম লক্ষ্য।
১০. বিলুপ্তির ঝুঁকি
অতিরিক্ত শিকার ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে কিছু প্রজাতি এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সান্ডা সংরক্ষণ জরুরি।
সান্ডা শুধু একটি রহস্যময় প্রাণী নয়, বরং এটি একটি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষাকারী গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে এই প্রাণীটিকে রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।








